শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজারে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভিড় করছে মানুষ।
তবে চিকিৎসকদের মতে, এ সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজ উদ্যোগে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রবণতা—যা রোগ সারানোর বদলে ভবিষ্যতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী,জানুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। তাদের মধ্যে কেউ এসেছেন শ্বাসকষ্ট নিয়ে,কেউ এসেছেন জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে,আবার কারও ধরা পড়ছে নিউমোনিয়া। যদিও এসব রোগের অধিকাংশই ভাইরাসজনিত, তবুও অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছেন।
🔹অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে ধারণা
টেকনাফ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ষাটোর্ধ্ব শাহজালাল করিম।শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি তার জ্বর সর্দিও হয়েছে। তার সাথে কথা হলে তিনি টিটিএন কে জানান, “আমার অ্যাজমার সমস্যা আছে।হঠাৎ ঠান্ডায় শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে এসেছি।
জ্বর হলে প্রাথমিকভাবে কি ওষুধ খান জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জ্বরের ওষুধ তো Ace বা নাপা জাতীয় প্যারাসিটামল।জ্বর হলে এগুলোই খাই। বেশি সমস্যা হলে অ্যান্টিবায়োটিক খাই। চিকিৎসকের পরামর্শের কি দরকার?”
আরেক রোগী এসেছেন নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে। তিনি বলেন,”জ্বর হলে অ্যান্টিবায়োটিক খাই।অ্যান্টিবায়োটিক খেলে খুব কম সময়ের মধ্যেই জ্বর সেরে যায়। তাই আলাদা করে ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এখন অতিরিক্ত ঠান্ডায় শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেড়ে গেছে তাই হাসপাতালে এসেছি।”
অসুস্থ হলেই রোগীরা অ্যান্টিবায়োটিক সেবনকে খুবই সহজলভ্য মনে করলেও এ ব্যাপারে জটিল ধারণা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
🔹কেন শীতে অ্যান্টিবায়োটিক ঝুঁকিপূর্ণ?
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাহান নাজির বলেন,“শীতকালে সর্দি-কাশি ও জ্বরের বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত। এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো উপকার করে না। বরং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ভবিষ্যতে ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।”
তিনি জানান,অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ওষুধ, ভাইরাসের নয়। পাড়া-মহল্লার ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া একটি ভয়ংকর প্রবণতা, যা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে।
🔹অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কি
ডাক্তার শাহজাহান নাজিরের ভাষ্যে,অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলতে বোঝায় এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আর কার্যকর থাকে না।এর ফলে আগে যে সংক্রমণ সহজেই সেরে যেত, তা পরবর্তীতে জটিল ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন,এর ফলে চিকিৎসা ব্যয় ও সময় যেমন বেড়ে যায়, তেমনি ভবিষ্যতে অনেক সাধারণ রোগের কার্যকর চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
🔹শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকি
এই চিকিৎসকের মতে, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় শীতের সময় তারা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। সামান্য সর্দি-কাশিও নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টে রূপ নিতে পারে।
ডা. শাহজাহান বলেন,“শিশুদের সকালে, সন্ধ্যায় ও রাতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে নেওয়া উচিত নয়। গরম কাপড় ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।”
🔹অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প
ডা. শাহজাহান নাজির বলেন,”অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো সরাসরি বিকল্প নেই, কারণ এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের নির্দিষ্ট চিকিৎসা। তবে সব রোগে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না।”
“সর্দি, কাশি, ফ্লু বা সাধারণ জ্বরের মতো ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।তাই রোগের ধরন সঠিকভাবে নির্ণয় করে পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ও নিরাপদ বিকল্প”,জানান মি. শাহজাহান।
🔹 শীত মোকাবেলায় করণীয়
সচেতনতা ছাড়া শীত মোকাবিলা অসম্ভব বলে মনে করেন ডা. শাহজাহান। তিনি জানান,শীতকালীন রোগ প্রতিরোধে ওষুধের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা।হুটহাট ওষুধ সেবন না করে গরম কাপড় পরা,কুসুম গরম পানি পান, ধোঁয়া ও ধুলাবালি এড়িয়ে চলা,পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এসব সাধারণ অভ্যাসই শীতজনিত রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
আফজারা রিয়া 























