ঢাকা ০৬:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চলতি বছরেই দেশে ফিরবো: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা কক্সবাজারে শুরু হয়েছে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন উখিয়ায় ১ লাখ ইয়াবাসহ আটক ১, পলাতক ৪ বাংলাদেশ নাম শুনেই থামলেন মার্টিনেজ, বললেন ‘বাংলাদেশের ভক্তদের ভালোবাসি’ চূড়ান্ত হলো নকআউটের ৩২ দল, বিশ্বকাপ থেকে যাদের বিদায় চকরিয়ায় মাইক্রোবাস-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, নিহত ২ ‘এই দেশটিকে আমি ভালোবাসি’, বাংলাদেশ নিয়ে যা বললেন মার্টিনেজ ইনানী সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটক সায়েমের মরদেহ উদ্ধার উখিয়ার হারেসের সুরে মুগ্ধ নেট দুনিয়া,সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবী কক্সবাজারে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের স্বীকৃতি: জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মে ফিচারড SURGE Bangladesh শহরের কুতুবদিয়া পাড়ার আলোচিত রোজিনাকে আটক করেছে পুলিশ বিয়ের অতিথি ১০০ ছাড়ালে জনপ্রতি ১০০০ টাকা ট্যাক্স বসানোর দাবি এমপির বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ করতে আইসিসিতে চিঠি সাবেক বিসিবি সভাপতির টেকনাফে সড়কের দুই পাশে কলেমা লেখা সাদা পতাকা আ’র’কা’ন আ’র্মি প্রধানের বাংলাদেশে চিকিৎসা নেওয়ার খবর কতটুকু সত্য?

চলতি বছরেই দেশে ফিরবো: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

বিগত প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি কাগুজে সংগঠন নয়, এটি একটি ‘শক্তি’। সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর হামলা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত ২৩ জুন দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হওয়ার পর তার এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: আপনার সমর্থকেরা আশাবাদী যে আপনি দ্রুতই বাংলাদেশে ফিরবেন। কিছু নেতা বলছেন এটি চলতি বছরই হতে পারে। আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকা সত্ত্বেও এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: আমার ফেরা কোনও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না, করি মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নপূরণের জন্য।

আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে তা কোনও বিচার নয়, এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করতেই বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, তবে সব ভেঙে আমি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। সাধারণ মানুষের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছি। তাই সব বাধা উপেক্ষা করে আমি চলতি বছরই দেশে ফিরব।

প্রশ্ন: বর্তমান সরকারের কিছু ঘাটতির সুযোগে আওয়ামী লীগ আবার জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি দলের আছে?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ বাংলার মাটিতে, মানুষের হৃদয়ে এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের গভীরে প্রোথিত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের পথচলায় এই দলের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে, রক্ত ঝরেছে এবং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই মানুষের শক্তিতে এটি আবার জেগে উঠেছে। আওয়ামী লীগের ফিরে আসা অন্য কারও ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে না।

একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে দলটিকে মুছে ফেলা যায়নি। প্রথমে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকার এবং এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখছে। দেশে কোনও গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছে এবং চরমপন্থা ছড়াচ্ছে। মানুষ এখন আগের আমলের সঙ্গে তুলনা করতে পারছে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন থাকে। দমন-পীড়ন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করছে। আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি বন্ধ করতে সেনা, বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে; এটি বর্তমান সরকারের দুর্বলতারই প্রমাণ।

প্রশ্ন: দল এখনও নিষিদ্ধ এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে দলের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনও সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর। অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো সাজানো নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে দূরে রেখেছে, দলের কার্যালয় বন্ধ করেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছতে পারেনি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সব নির্যাতন সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে যোগ দিচ্ছে।

বাংলাদেশে একটি সঠিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। তবে বর্তমান দখলদারেরা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ রাখে, তবে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও বেদনা থেকেই নতুন পথ তৈরি হবে।

প্রশ্ন: ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে পাকিস্তানের মতো মডেলে রূপান্তর হচ্ছে বলতে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

শেখ হাসিনা: আমি কোনও দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধী নই। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে রাষ্ট্রের মূল নীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে। ৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আঘাত দেখতে পেয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতোর মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে, স্মৃতিসৌধ ভাঙচুর করা হয়েছে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা হয়েছে। মাজার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হয়েছে। চরমপন্থা ছড়ানোর সুযোগ করে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব আয়োজন করা হয়েছে।

অথচ আওয়ামী লীগের সময়ে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২৫ শতাংশ, মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলারে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। আমরা দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম, শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলাম। ছিটমহল ও ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করেছি এবং ছাদহীন ৪২ লাখেরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে জমিসহ ঘর দিয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছিলাম। ৫ আগস্টের পর দেশের এই উন্নয়ন যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে এবং উগ্রবাদের রাজত্ব তৈরি করা হয়েছে, তা থেকে কেবল আওয়ামী লীগই দেশকে মুক্ত করতে পারে। মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই জিতবে, তা ইউনূস ও বাংলাদেশ-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি খুব ভালো করেই জানে। সে কারণেই তারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে।

প্রশ্ন: হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর এবং কিছু ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর হুমকি নিয়ে যে প্রতিবেদন আসছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শেখ হাসিনা: এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও গভীর উদ্বেগের। বাংলাদেশে যখনই অসাম্প্রদায়িক বা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে, তখনই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নেমে এসেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া এবং সুফি মাজারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অনিরাপদ হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো, অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও এই ঘটনাগুলো অস্বীকার করছে বা রাজনৈতিক প্রচার বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এই অস্বীকারের সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে। সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনও মিথ্যা মামলায় কারাগারে আছেন। এটিই প্রমাণ করে যে সরকার পরিবর্তন হলেও সংখ্যালঘুদের ভাগ্য বদলায়নি।

সংখ্যালঘুরা কোনও ভোটব্যাংক নয়, তারা সমান মর্যাদার নাগরিক। যারা ধর্মের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং হামলার সুষ্ঠু বিচার হতে হবে। এই কর্তব্যে ব্যর্থতা কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাই নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

প্রশ্ন: ভারতে আপনার বর্তমান জীবন কীভাবে কাটছে? আপনার মেয়ের সঙ্গে কি নিয়মিত দেখা হয়, নাকি নির্বাসিত জীবন অনেকটাই সীমাবদ্ধ?

শেখ হাসিনা: দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্যক্তিগত জীবন বলতে তেমন কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে সব হারানোর পরও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। আজ বাংলাদেশ যখন আবার একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের মানুষের থেকে দূরে থাকা, আমার মাটির গন্ধ থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিদিন আমার নেতাকর্মীদের কষ্টের কথা শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার স্বাভাবিক যোগাযোগ রয়েছে। তবে আমার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে। আজ আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দূর থেকে হলেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের চিত্র তুলে ধরি। আমার লড়াই থামেনি। বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং জাতির পিতার আদর্শই আমার শক্তি। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে এবং আওয়ামী লীগ জনগণের শক্তিতে আবার জেগে উঠবে। শেষ দিন পর্যন্ত আমি এই সংগ্রামের সঙ্গেই থাকব।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

চলতি বছরেই দেশে ফিরবো: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

চলতি বছরেই দেশে ফিরবো: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

আপডেট সময় : ০৫:১২:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

বিগত প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি কাগুজে সংগঠন নয়, এটি একটি ‘শক্তি’। সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর হামলা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত ২৩ জুন দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হওয়ার পর তার এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: আপনার সমর্থকেরা আশাবাদী যে আপনি দ্রুতই বাংলাদেশে ফিরবেন। কিছু নেতা বলছেন এটি চলতি বছরই হতে পারে। আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকা সত্ত্বেও এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: আমার ফেরা কোনও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না, করি মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নপূরণের জন্য।

আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে তা কোনও বিচার নয়, এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করতেই বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, তবে সব ভেঙে আমি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। সাধারণ মানুষের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছি। তাই সব বাধা উপেক্ষা করে আমি চলতি বছরই দেশে ফিরব।

প্রশ্ন: বর্তমান সরকারের কিছু ঘাটতির সুযোগে আওয়ামী লীগ আবার জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি দলের আছে?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ বাংলার মাটিতে, মানুষের হৃদয়ে এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের গভীরে প্রোথিত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের পথচলায় এই দলের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে, রক্ত ঝরেছে এবং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই মানুষের শক্তিতে এটি আবার জেগে উঠেছে। আওয়ামী লীগের ফিরে আসা অন্য কারও ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে না।

একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে দলটিকে মুছে ফেলা যায়নি। প্রথমে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকার এবং এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখছে। দেশে কোনও গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছে এবং চরমপন্থা ছড়াচ্ছে। মানুষ এখন আগের আমলের সঙ্গে তুলনা করতে পারছে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন থাকে। দমন-পীড়ন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করছে। আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি বন্ধ করতে সেনা, বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে; এটি বর্তমান সরকারের দুর্বলতারই প্রমাণ।

প্রশ্ন: দল এখনও নিষিদ্ধ এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে দলের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনও সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর। অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো সাজানো নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে দূরে রেখেছে, দলের কার্যালয় বন্ধ করেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছতে পারেনি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সব নির্যাতন সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে যোগ দিচ্ছে।

বাংলাদেশে একটি সঠিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। তবে বর্তমান দখলদারেরা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ রাখে, তবে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও বেদনা থেকেই নতুন পথ তৈরি হবে।

প্রশ্ন: ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে পাকিস্তানের মতো মডেলে রূপান্তর হচ্ছে বলতে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

শেখ হাসিনা: আমি কোনও দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধী নই। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে রাষ্ট্রের মূল নীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে। ৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আঘাত দেখতে পেয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতোর মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে, স্মৃতিসৌধ ভাঙচুর করা হয়েছে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা হয়েছে। মাজার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হয়েছে। চরমপন্থা ছড়ানোর সুযোগ করে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব আয়োজন করা হয়েছে।

অথচ আওয়ামী লীগের সময়ে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২৫ শতাংশ, মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলারে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। আমরা দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম, শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলাম। ছিটমহল ও ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করেছি এবং ছাদহীন ৪২ লাখেরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে জমিসহ ঘর দিয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছিলাম। ৫ আগস্টের পর দেশের এই উন্নয়ন যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে এবং উগ্রবাদের রাজত্ব তৈরি করা হয়েছে, তা থেকে কেবল আওয়ামী লীগই দেশকে মুক্ত করতে পারে। মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই জিতবে, তা ইউনূস ও বাংলাদেশ-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি খুব ভালো করেই জানে। সে কারণেই তারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে।

প্রশ্ন: হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর এবং কিছু ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর হুমকি নিয়ে যে প্রতিবেদন আসছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শেখ হাসিনা: এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও গভীর উদ্বেগের। বাংলাদেশে যখনই অসাম্প্রদায়িক বা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে, তখনই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নেমে এসেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া এবং সুফি মাজারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অনিরাপদ হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো, অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও এই ঘটনাগুলো অস্বীকার করছে বা রাজনৈতিক প্রচার বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এই অস্বীকারের সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে। সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনও মিথ্যা মামলায় কারাগারে আছেন। এটিই প্রমাণ করে যে সরকার পরিবর্তন হলেও সংখ্যালঘুদের ভাগ্য বদলায়নি।

সংখ্যালঘুরা কোনও ভোটব্যাংক নয়, তারা সমান মর্যাদার নাগরিক। যারা ধর্মের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং হামলার সুষ্ঠু বিচার হতে হবে। এই কর্তব্যে ব্যর্থতা কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাই নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

প্রশ্ন: ভারতে আপনার বর্তমান জীবন কীভাবে কাটছে? আপনার মেয়ের সঙ্গে কি নিয়মিত দেখা হয়, নাকি নির্বাসিত জীবন অনেকটাই সীমাবদ্ধ?

শেখ হাসিনা: দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্যক্তিগত জীবন বলতে তেমন কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে সব হারানোর পরও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। আজ বাংলাদেশ যখন আবার একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের মানুষের থেকে দূরে থাকা, আমার মাটির গন্ধ থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিদিন আমার নেতাকর্মীদের কষ্টের কথা শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার স্বাভাবিক যোগাযোগ রয়েছে। তবে আমার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে। আজ আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দূর থেকে হলেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের চিত্র তুলে ধরি। আমার লড়াই থামেনি। বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং জাতির পিতার আদর্শই আমার শক্তি। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে এবং আওয়ামী লীগ জনগণের শক্তিতে আবার জেগে উঠবে। শেষ দিন পর্যন্ত আমি এই সংগ্রামের সঙ্গেই থাকব।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন