অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। মমিনুল হকের ব্যাট থেকে জয়সূচক শটটি বাউন্ডারি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন। অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে টাইগাররা।
ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টে জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল মাত্র ৫৭ রান। সেই রান মাত্র ১৪.২ ওভারে তুলে নেয় বাংলাদেশ। শাদমান ইসলাম অপরাজিত ৩৩ এবং মমিনুল হক অপরাজিত ১৬ রান করে দলকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন।
এই জয়কে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হবে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জেতা বরাবরই বিশ্বের যেকোনো দলের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে এশিয়ার দলগুলোর জন্য অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে জয় পাওয়া আরও কঠিন।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাকিস্তান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাকিস্তান সর্বশেষ টেস্ট জিতেছিল ১৯৯৫ সালে সিডনিতে। এরপর প্রায় তিন দশকে ওয়াসিম আকরাম, সাকলায়েন মুশতাক, শোয়েব আখতার, মোহাম্মদ ইউসুফ, ইউনুস খানসহ পাকিস্তানের একাধিক প্রজন্মের তারকা অস্ট্রেলিয়ায় খেলেছেন। কিন্তু টেস্ট জয় ধরা দেয়নি।
সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই এবার বাংলাদেশ শুধু জয়ই পেল না, পেল দাপুটে জয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের বোলাররা অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখেন। প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ। দুর্দান্ত বোলিং করে হাসান মাহমুদ একাই নেন ৬ উইকেট। তাঁর গতিময় ও নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ বড় সংগ্রহ গড়তে ব্যর্থ হয়।
জবাবে ব্যাট হাতে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে ৪২৬ রান করে টাইগাররা। ফলে প্রথম ইনিংসেই ২২৮ রানের বিশাল লিড পেয়ে যায় বাংলাদেশ।
এই ইনিংসে ইতিহাস গড়েন তানজিদ হাসান তামিম। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন তিনি। তাঁর ১০১ রানের অসাধারণ ইনিংস বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের ভিত্তি তৈরি করে। মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটিং অবদানও বাংলাদেশের লিড বড় করতে বড় ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরন গ্রিন করেন ১০৪ রান। তবে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের সামনে শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তিনি তুলে নেন ৫ উইকেট। হাসান মাহমুদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে দেয়।
ফলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৭ রান। সেই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র এক উইকেট হারায় বাংলাদেশ। মমিনুল হকের ব্যাট থেকে আসা জয়সূচক শটটি বাউন্ডারি স্পর্শ করতেই ইতিহাসের পাতায় উঠে যায় বাংলাদেশের নাম।
বাংলাদেশের জন্য এই জয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছে দলটি। ২০০৩ সালের পর দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো টেস্ট খেলতে পারেনি বাংলাদেশ।
অন্যদিকে নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া বরাবরই টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল। অ্যাশেজে তাদের দাপট, ঘরের মাঠে ভারতের মতো দলের বিপক্ষে বড় জয় এবং পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজসহ বিভিন্ন দলের বিপক্ষে আধিপত্য অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে তাদের শক্তির প্রমাণ দেয়।
সেই শক্তিশালী দলকেই এবার চার দিনের মধ্যে ৯ উইকেটে হারিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।
জয়ের পথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দলীয় পারফরম্যান্স। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত পেস বোলিং, তানজিদ হাসান তামিমের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি, মুমিনুল ও শান্তদের দৃঢ় ব্যাটিং এবং মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে ম্যাচজুড়ে অস্ট্রেলিয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে বাংলাদেশ।
প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দেওয়া, এরপর ৪২৬ রান করে ২২৮ রানের লিড নেওয়া, দ্বিতীয় ইনিংসে স্বাগতিকদের ২৮৪ রানে থামিয়ে দেওয়া এবং শেষে মাত্র এক উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেওয়া—পুরো ম্যাচেই ছিল বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ।
এই জয় শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের জয় নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের মানসিকতায়ও বড় পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশকে ২৩ বছর টেস্ট খেলার সুযোগ দেওয়া হয়নি, সেই মাটিতেই ফিরে এসে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে টাইগাররা।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় তাই নিঃসন্দেহে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন।
অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ ও ২৮৪ রান।
বাংলাদেশ ৪২৬ ও ৫৭/১।
৯ উইকেটের এই ঐতিহাসিক জয়ে বাংলাদেশ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল।
সায়ন্তন ভট্টাচার্য : 























