ঢাকা ১১:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে উচ্ছেদ নয়, নিরাপদ ও স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস বাহাদুরের সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের দাবি প্রতিশোধ নিতে সাংবাদিক আরাফাত সানিকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় প্রতিশোধ নিতে সাংবাদিক আরাফাত সানিকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় সাংবাদিক আরাফাত সানিকে আটক: ক্র্যাকের নিন্দা, সোমবার মানববন্ধন মামলা দিয়ে অনুসন্ধানি সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না-মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা চকরিয়ার মালুম ঘাটে সেনাবাহিনীর অভিযান: সন্ত্রাসী আটক গর্জনিয়ায় যৌথবাহিনীর হাতে আটক আরএসও সদস্য গণতন্ত্রের আরেক নাম বিএনপি- পেকুয়ায় পথসভায় সালাহউদ্দিন আহমদ সি-ট্রাক উদ্বোধনের ফলে কুতুবদিয়াবাসীর আকাঙ্খা পূরণ হবে- নৌ উপদেষ্টা কক্সবাজারে সেনাবাহিনীর অভিযানে কোটি টাকার লেনদেনের নথি ও অস্ত্রসহ আটক ৪ চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার পরিবারের আত্মার ও আবেগের সম্পর্ক : তারেক রহমান চট্টগ্রামের ভাষায় তারেক রহমান বললেন, ‘অনেরা ক্যান আছন’ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল দেশ গঠনে তরুণদের পরামর্শ চান তারেক রহমান রামুতে পাওয়া গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বড় বো মা! 

জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব করতে চায়’ যুক্তরাষ্ট্র

  • টিটিএন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:৩১:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • 273

বাংলাদেশে অতীতে দুইবার নিষিদ্ধ হওয়া দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নতুন করে সখ্য গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ছাত্র রাজনীতিতে দলটির প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন জামায়াতকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, আগামী নির্বাচনে জামায়াত বড় ধরনের সাফল্য পেতে পারে। এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র দলটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা ‘বন্ধুত্ব’ স্থাপনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনও কট্টর অবস্থান নিলে, ওয়াশিংটন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি পোশাক খাতে উচ্চ শুল্ক আরোপসহ কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো:

আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে দেশটির বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী অভাবনীয় ভালো ফল করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন মার্কিন কূটনীতিকরা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে শেখ হাসিনার সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। ঐতিহাসিকভাবে দলটি শরিয়াহ আইন ও শিশুদের লালন-পালনের সুবিধার্থে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর পক্ষে কথা বললেও, সম্প্রতি তারা জনমনে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে তারা প্রধানত দুর্নীতি নির্মূলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানাচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন কূটনীতিকরা এই ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামিক ধারায়’ মোড় নিয়েছে। অডিও রেকর্ড অনুযায়ী ওই কূটনীতিক ধারণা প্রকাশ করেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে যাচ্ছে।

ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।’ তিনি সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করেন, তারা কি জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাবেন? তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের অনুষ্ঠানে আসবে?’

নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করা ওই মার্কিন কূটনীতিক জামায়াত কর্তৃক শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়ার শঙ্কাকে নাকচ করে দেন। তিনি জানান, ওয়াশিংটন প্রয়োজনে চাপ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তিনি বলেন, ‘আমি মোটেও বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দিতে পারবে।’ তিনি আরও বলেছেন, যদি দলটির নেতারা উদ্বেগজনক কোনও পদক্ষেপ নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই তাদের ওপর ‘শতভাগ ট্যারিফ (শুল্ক)’ আরোপ করবে।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্টকে এক বিবৃতিতে বলেন, ডিসেম্বরের সেই বৈঠকটি ছিল মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি নিয়মিত ও ঘরোয়া আলোচনা। তিনি জানান, সেখানে অনেক রাজনৈতিক দল নিয়েই আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনও বিশেষ দলের পক্ষ নেয় না। বাংলাদেশের জনগণ যাদের নির্বাচিত করবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে জানান, একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে দেওয়া মন্তব্যের বিষয়ে তারা কোনও মন্তব্য করতে চান না।

এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিত এসব মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকালে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন কূটনীতিকরা কী ভাবছেন। শেখ হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং আসন্ন নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়, যা দশকের পর দশক ধরে চলা অস্থিতিশীলতার পর একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনা বলে মনে করা হচ্ছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে এই মার্কিন যোগাযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, রাশিয়ার তেল ক্রয় ও বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে এমনিতেই দুই দেশের সম্পর্ক এখন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কুগেলম্যান বলেন, ‘বহু বছর ধরে বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো জামায়াত।’ তার মতে, ভারত এই দলটিকে পাকিস্তানের মিত্র এবং তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

তবে মনিকা শাই তার বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রভাব ভারত-মার্কিন সম্পর্কে পড়বে না। ঢাকা ও নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিজস্ব গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।

মূলধারায়’ ফিরছে জামায়াত

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ নানা চড়াই-উতরাই পার করেছে। বিগত কয়েক দশকে দেশটি সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র এবং প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি শাসন দেখেছে। চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাটাও ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। শেখ হাসিনা ছিলেন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি সেখানেই আশ্রয় নিয়েছেন। নভেম্বরে বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত তাকে ফেরত পাঠায়নি।

ডিসেম্বরের বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা ছিল রাজনৈতিকভাবে একটি চতুর কৌশল।’ তিনি মনে করেন ট্রাইব্যুনাল পুরোপুরি ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ’ না হলেও তারা হাসিনার অপরাধ প্রমাণ করতে পেরেছে, যা ছিল লক্ষ্যণীয়।

বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর সাম্প্রতিক কিছু হামলার ঘটনা দুই দেশের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রামে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করেছে ভারত, অন্যদিকে দিল্লিতে হিন্দুত্ববাদী বিক্ষোভকারীরা ড. ইউনূসের ছবি পোড়ানোর পর বাংলাদেশও সেখানে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখে।

অন্তর্বর্তী সরকার দেশে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি পরিবার, আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ গত সপ্তাহে এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশার হাসানের মতে, দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকার পর জামায়াত এখন মূলধারার রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরছে। জামায়াত মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, তারা ‘দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা ও সুশাসন’, এই এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং শরিয়াহ আইন চালুর কোনও পরিকল্পনা নেই।

নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন, নির্বাচনে জিতলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, তারেক রহমানও মনে করেন জামায়াত নির্বাচনে ভালো করবে, তবে তিনি তাদের নিয়ে জোট সরকার গঠনের পক্ষে নন।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান গত জানুয়ারিতে রয়টার্সকে বলেছিলেন, তারা বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে জামায়াত শরিক দল ছিল।

২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর থেকে জামায়াত ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চারটি এবং ঢাকায় বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে। এমনকি গত শুক্রবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গেও জামায়াত আমিরের ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব বৈঠককে ‘রুটিন কূটনৈতিক কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

ঢাকায় মার্কিন কূটনীতিক আভাস দিয়েছেন, জামায়াত ছাড়াও তারা হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের মতো রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক, যাতে প্রয়োজনে তাদের ফোনে পাওয়া যায় এবং সরাসরি কথা বলা যায়।’

তবে ওই কূটনীতিক সতর্ক করে বলেন, জামায়াত যদি ক্ষমতায় এসে ওয়াশিংটনের স্বার্থবিরোধী নীতি গ্রহণ করে, তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর বড় আঘাত আসবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। যদি তারা নারীদের কাজের অধিকার হরণ করে বা শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেয়, তবে আর কোনও অর্ডার (ক্রয়াদেশ) আসবে না। আর অর্ডার না থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও থাকবে না।’ তবে তিনি এও বিশ্বাস করেন যে, জামায়াত এমনটা করবে না কারণ দলটিতে অনেক শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষ রয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে ভারতের উদ্বেগ কমবে না। কুগেলম্যান বলেন, ভারত-মার্কিন সম্পর্ক যদি ভালো অবস্থায় থাকত, তবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভারতের উদ্বেগ আমলে নিত। কিন্তু বর্তমান বৈরী সম্পর্কের জেরে মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতের উদ্বেগকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না।

সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে উচ্ছেদ নয়, নিরাপদ ও স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস বাহাদুরের

This will close in 6 seconds

জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব করতে চায়’ যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট সময় : ১২:৩১:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে অতীতে দুইবার নিষিদ্ধ হওয়া দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নতুন করে সখ্য গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ছাত্র রাজনীতিতে দলটির প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন জামায়াতকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, আগামী নির্বাচনে জামায়াত বড় ধরনের সাফল্য পেতে পারে। এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র দলটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা ‘বন্ধুত্ব’ স্থাপনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনও কট্টর অবস্থান নিলে, ওয়াশিংটন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি পোশাক খাতে উচ্চ শুল্ক আরোপসহ কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো:

আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে দেশটির বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী অভাবনীয় ভালো ফল করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন মার্কিন কূটনীতিকরা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে শেখ হাসিনার সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। ঐতিহাসিকভাবে দলটি শরিয়াহ আইন ও শিশুদের লালন-পালনের সুবিধার্থে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর পক্ষে কথা বললেও, সম্প্রতি তারা জনমনে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে তারা প্রধানত দুর্নীতি নির্মূলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানাচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন কূটনীতিকরা এই ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামিক ধারায়’ মোড় নিয়েছে। অডিও রেকর্ড অনুযায়ী ওই কূটনীতিক ধারণা প্রকাশ করেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে যাচ্ছে।

ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।’ তিনি সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করেন, তারা কি জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাবেন? তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের অনুষ্ঠানে আসবে?’

নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করা ওই মার্কিন কূটনীতিক জামায়াত কর্তৃক শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়ার শঙ্কাকে নাকচ করে দেন। তিনি জানান, ওয়াশিংটন প্রয়োজনে চাপ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তিনি বলেন, ‘আমি মোটেও বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দিতে পারবে।’ তিনি আরও বলেছেন, যদি দলটির নেতারা উদ্বেগজনক কোনও পদক্ষেপ নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই তাদের ওপর ‘শতভাগ ট্যারিফ (শুল্ক)’ আরোপ করবে।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্টকে এক বিবৃতিতে বলেন, ডিসেম্বরের সেই বৈঠকটি ছিল মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি নিয়মিত ও ঘরোয়া আলোচনা। তিনি জানান, সেখানে অনেক রাজনৈতিক দল নিয়েই আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনও বিশেষ দলের পক্ষ নেয় না। বাংলাদেশের জনগণ যাদের নির্বাচিত করবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে জানান, একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে দেওয়া মন্তব্যের বিষয়ে তারা কোনও মন্তব্য করতে চান না।

এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিত এসব মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকালে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন কূটনীতিকরা কী ভাবছেন। শেখ হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং আসন্ন নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়, যা দশকের পর দশক ধরে চলা অস্থিতিশীলতার পর একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনা বলে মনে করা হচ্ছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে এই মার্কিন যোগাযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, রাশিয়ার তেল ক্রয় ও বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে এমনিতেই দুই দেশের সম্পর্ক এখন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কুগেলম্যান বলেন, ‘বহু বছর ধরে বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো জামায়াত।’ তার মতে, ভারত এই দলটিকে পাকিস্তানের মিত্র এবং তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

তবে মনিকা শাই তার বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রভাব ভারত-মার্কিন সম্পর্কে পড়বে না। ঢাকা ও নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিজস্ব গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।

মূলধারায়’ ফিরছে জামায়াত

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ নানা চড়াই-উতরাই পার করেছে। বিগত কয়েক দশকে দেশটি সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র এবং প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি শাসন দেখেছে। চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাটাও ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। শেখ হাসিনা ছিলেন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি সেখানেই আশ্রয় নিয়েছেন। নভেম্বরে বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত তাকে ফেরত পাঠায়নি।

ডিসেম্বরের বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা ছিল রাজনৈতিকভাবে একটি চতুর কৌশল।’ তিনি মনে করেন ট্রাইব্যুনাল পুরোপুরি ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ’ না হলেও তারা হাসিনার অপরাধ প্রমাণ করতে পেরেছে, যা ছিল লক্ষ্যণীয়।

বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর সাম্প্রতিক কিছু হামলার ঘটনা দুই দেশের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রামে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করেছে ভারত, অন্যদিকে দিল্লিতে হিন্দুত্ববাদী বিক্ষোভকারীরা ড. ইউনূসের ছবি পোড়ানোর পর বাংলাদেশও সেখানে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখে।

অন্তর্বর্তী সরকার দেশে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি পরিবার, আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ গত সপ্তাহে এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশার হাসানের মতে, দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকার পর জামায়াত এখন মূলধারার রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরছে। জামায়াত মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, তারা ‘দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা ও সুশাসন’, এই এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং শরিয়াহ আইন চালুর কোনও পরিকল্পনা নেই।

নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন, নির্বাচনে জিতলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, তারেক রহমানও মনে করেন জামায়াত নির্বাচনে ভালো করবে, তবে তিনি তাদের নিয়ে জোট সরকার গঠনের পক্ষে নন।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান গত জানুয়ারিতে রয়টার্সকে বলেছিলেন, তারা বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে জামায়াত শরিক দল ছিল।

২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর থেকে জামায়াত ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চারটি এবং ঢাকায় বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে। এমনকি গত শুক্রবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গেও জামায়াত আমিরের ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব বৈঠককে ‘রুটিন কূটনৈতিক কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

ঢাকায় মার্কিন কূটনীতিক আভাস দিয়েছেন, জামায়াত ছাড়াও তারা হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের মতো রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক, যাতে প্রয়োজনে তাদের ফোনে পাওয়া যায় এবং সরাসরি কথা বলা যায়।’

তবে ওই কূটনীতিক সতর্ক করে বলেন, জামায়াত যদি ক্ষমতায় এসে ওয়াশিংটনের স্বার্থবিরোধী নীতি গ্রহণ করে, তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর বড় আঘাত আসবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। যদি তারা নারীদের কাজের অধিকার হরণ করে বা শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেয়, তবে আর কোনও অর্ডার (ক্রয়াদেশ) আসবে না। আর অর্ডার না থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও থাকবে না।’ তবে তিনি এও বিশ্বাস করেন যে, জামায়াত এমনটা করবে না কারণ দলটিতে অনেক শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষ রয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে ভারতের উদ্বেগ কমবে না। কুগেলম্যান বলেন, ভারত-মার্কিন সম্পর্ক যদি ভালো অবস্থায় থাকত, তবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভারতের উদ্বেগ আমলে নিত। কিন্তু বর্তমান বৈরী সম্পর্কের জেরে মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতের উদ্বেগকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না।

সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন