ঢাকা ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ফোর্টিফাই রাইটসের বিবৃতি – আরসা প্রধান আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দাবি কুতুবদিয়ায় পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হা’ম’লা চকরিয়ায় বাসের ধাক্কায় পথচারী নিহত কুকুরের নৈপুণ্যে টায়ারের ভেতর মিলল ইয়াবা চকরিয়ায় মাদকাসক্ত ছেলের হাতে প্রাণ গেল বৃদ্ধ বাবার প্যাসিফিক বীচ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে ছাই ৩ কটেজ, ক্ষতি ৭০ লাখ টাকা খেলাঘরের মানববন্ধন :শিশুর ধর্ষক ও হত্যাকারীদের দ্রুত এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী ঈদের দিন কেমন থাকবে আবহাওয়া নতুন আলোচনায় কারা?  / উখিয়ায় ৬ বছর ধরে ‘মেয়াদউর্ত্তীণ’ ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটি  চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা, জড়িতদের শাস্তি দাবি অভিযুক্ত ডিবি কার্যালয়ে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে র‍্যাব ​টেকনাফে তরুণদের কারিগরি দক্ষতা মেলা ও ট্যালেন্ট হান্ট অনুষ্ঠিত কুতুবদিয়ায় ভূমি বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা সম্পন্ন চকরিয়ায় পৃথক ঘটনায় একদিনে তিনজনের মৃত্যু
মন্তব্য কলাম

রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের দ্বৈত ন্যারেটিভ: কেন এই দ্বন্দ্ব?

কক্সবাজারের শিবিরে ভোরের আলো ফুটতেই সারি সারি ত্রিপলের ঘরগুলো জেগে ওঠে। শিশুরা খালি পায়ে ছুটে যায় ঝুপড়ি গলির ভেতর, মায়েরা কাঁধে পানি তোলার কলসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লাইন ধরে। এই দৃশ্য এখন পরিচিত, কিন্তু কোনো দেশের নাগরিকত্ব নেই, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। এরা রোহিঙ্গা, যাদের জীবন আটকে আছে সীমান্তের ওপারে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার কারণে।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আজও তাদের ফেরার দিন আসেনি। এই সময়ে জাতিসংঘ নানা পদক্ষেপ, প্রতিবেদন ও আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে শোনা যাচ্ছে দ্বৈত সুর; একদিকে বলা হচ্ছে “চূড়ান্ত সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই”, অন্যদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে। সাধারণ মানুষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে; এমন সাংঘর্ষিক অবস্থান কেন?

জাতিসংঘ আসলে একক কণ্ঠ নয়, বহু সংস্থার সমষ্টি। প্রতিটির কাজ ভিন্ন, তাই বক্তব্যও ভিন্ন। মানবিক সহায়তা বনাম রাজনৈতিক অবস্থান শিবিরে খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো; যেমন UNHCR, WFP বা UNICEF বাস্তবতার কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। তারা ফেরতের দরজা খোলা রাখতে কূটনৈতিকভাবে নরম সুরে কথা বলে। কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল বা তদন্ত মিশন বলছে সরাসরি, এখানে গণহত্যা হয়েছে, জবাবদিহি না হলে ফেরত সম্ভব নয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারকে রক্ষা করেছে, শক্ত পদক্ষেপ আটকে দিয়েছে। আবার পশ্চিমা দেশগুলো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চাইছে। এই দ্বন্দ্ব জাতিসংঘের ভাষাকে করেছে দুর্বল।

বাংলাদেশ চায় নিরাপদ প্রত্যাবাসন। সেই চাপে জাতিসংঘও বলে “সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই।” কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, রাখাইনে এখনো ফেরার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই। ফলে সৃষ্টি হয় সাংঘর্ষিক বার্তা “ফিরতে হবে” আবার একই সাথে “এখন ফেরা সম্ভব নয়।”

আট বছর পেরিয়েও সমাধান নেই। কেবল ত্রাণই আছে, আছে বেঁচে থাকার একরাশ সংগ্রাম। শিবিরে নতুন প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে, যাদের পরিচয় কেবল ‘শরণার্থী’। শিক্ষা, কাজ, ভবিষ্যৎ সবকিছু ঝুলে আছে অনিশ্চয়তায়। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু সীমিত সম্পদে এই বোঝা কতদিন টানা সম্ভব?

জাতিসংঘের দ্বৈত ন্যারেটিভ আসলে তিনটি স্তরের ফল বলে মনে করা হচ্ছে (১) মাঠপর্যায়ে মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন, (২) বড় শক্তির ভূরাজনৈতিক হিসাব, আর (৩) সংস্থাভেদে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। এর মধ্যেই আটকে আছে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ।

তাদের জীবনের আলো কবে ফিরবে, এ প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মানবিক সহায়তা যতদিন চলুক, সমাধান আসবে না দ্বিধা–দ্বন্দ্বে ভরা নরম কূটনীতির ভেতর দিয়ে। প্রয়োজন সাহসী পদক্ষেপ, জবাবদিহি আর রাজনৈতিক চাপ। নইলে কক্সবাজারের শিবিরে ভোরের আলো প্রতিদিনই ফুটবে, কিন্তু রোহিঙ্গাদের চোখে আলো জ্বলে উঠবে না।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, চিন্তক ও গবেষক।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য কলাম

রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের দ্বৈত ন্যারেটিভ: কেন এই দ্বন্দ্ব?

আপডেট সময় : ০২:৪০:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫

কক্সবাজারের শিবিরে ভোরের আলো ফুটতেই সারি সারি ত্রিপলের ঘরগুলো জেগে ওঠে। শিশুরা খালি পায়ে ছুটে যায় ঝুপড়ি গলির ভেতর, মায়েরা কাঁধে পানি তোলার কলসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লাইন ধরে। এই দৃশ্য এখন পরিচিত, কিন্তু কোনো দেশের নাগরিকত্ব নেই, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। এরা রোহিঙ্গা, যাদের জীবন আটকে আছে সীমান্তের ওপারে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার কারণে।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আজও তাদের ফেরার দিন আসেনি। এই সময়ে জাতিসংঘ নানা পদক্ষেপ, প্রতিবেদন ও আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে শোনা যাচ্ছে দ্বৈত সুর; একদিকে বলা হচ্ছে “চূড়ান্ত সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই”, অন্যদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে। সাধারণ মানুষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে; এমন সাংঘর্ষিক অবস্থান কেন?

জাতিসংঘ আসলে একক কণ্ঠ নয়, বহু সংস্থার সমষ্টি। প্রতিটির কাজ ভিন্ন, তাই বক্তব্যও ভিন্ন। মানবিক সহায়তা বনাম রাজনৈতিক অবস্থান শিবিরে খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো; যেমন UNHCR, WFP বা UNICEF বাস্তবতার কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। তারা ফেরতের দরজা খোলা রাখতে কূটনৈতিকভাবে নরম সুরে কথা বলে। কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল বা তদন্ত মিশন বলছে সরাসরি, এখানে গণহত্যা হয়েছে, জবাবদিহি না হলে ফেরত সম্ভব নয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারকে রক্ষা করেছে, শক্ত পদক্ষেপ আটকে দিয়েছে। আবার পশ্চিমা দেশগুলো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চাইছে। এই দ্বন্দ্ব জাতিসংঘের ভাষাকে করেছে দুর্বল।

বাংলাদেশ চায় নিরাপদ প্রত্যাবাসন। সেই চাপে জাতিসংঘও বলে “সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই।” কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, রাখাইনে এখনো ফেরার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই। ফলে সৃষ্টি হয় সাংঘর্ষিক বার্তা “ফিরতে হবে” আবার একই সাথে “এখন ফেরা সম্ভব নয়।”

আট বছর পেরিয়েও সমাধান নেই। কেবল ত্রাণই আছে, আছে বেঁচে থাকার একরাশ সংগ্রাম। শিবিরে নতুন প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে, যাদের পরিচয় কেবল ‘শরণার্থী’। শিক্ষা, কাজ, ভবিষ্যৎ সবকিছু ঝুলে আছে অনিশ্চয়তায়। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু সীমিত সম্পদে এই বোঝা কতদিন টানা সম্ভব?

জাতিসংঘের দ্বৈত ন্যারেটিভ আসলে তিনটি স্তরের ফল বলে মনে করা হচ্ছে (১) মাঠপর্যায়ে মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন, (২) বড় শক্তির ভূরাজনৈতিক হিসাব, আর (৩) সংস্থাভেদে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। এর মধ্যেই আটকে আছে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ।

তাদের জীবনের আলো কবে ফিরবে, এ প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মানবিক সহায়তা যতদিন চলুক, সমাধান আসবে না দ্বিধা–দ্বন্দ্বে ভরা নরম কূটনীতির ভেতর দিয়ে। প্রয়োজন সাহসী পদক্ষেপ, জবাবদিহি আর রাজনৈতিক চাপ। নইলে কক্সবাজারের শিবিরে ভোরের আলো প্রতিদিনই ফুটবে, কিন্তু রোহিঙ্গাদের চোখে আলো জ্বলে উঠবে না।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, চিন্তক ও গবেষক।