ফুটবল মাঠে কিছু দৃশ্য কখনো পুরনো হয় না। ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই, ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়াম। জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরে যাওয়ার পর ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক বিষণ্ণ জাদুকর। লিওনেল মেসির সেই শূন্য দৃষ্টি আর গাল বেয়ে পড়া জল শুধু আর্জেন্টিনার নয়, বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের বুক ভেঙে দিয়েছিল।
১২ বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ উল্টো। একের পর এক ট্রফি জয়, মাঠে অপরাজেয় আধিপত্য আর অধিনায়ক মেসির একের পর এক অতিমানবীয় রেকর্ড—সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী এবং তৃপ্ত ফ্যানবেজের নাম নিঃসন্দেহে ‘আর্জেন্টিনা’। কিন্তু এই সুখের গভীরতা বুঝতে হলে, সমর্থকদের পার হতে হয়েছে এক নরকতুল্য কষ্টের নদী।
‘না পাওয়ার’ সেই অন্ধকার অধ্যায়: মারাকানা থেকে ডালাস:
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বর্তমান আনন্দের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি হয়েছে মূলত বিগত এক দশকের তীব্র যন্ত্রণার ওপর ভর করে।
২০১৪-এর মারাকানা ট্র্যাজেডি: ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে একের পর এক সুযোগ মিস এবং শেষ মুহূর্তের গোল। ট্রফির এত কাছে গিয়েও তা ছুঁতে না পারার কষ্টটা ছিল সমর্থকদের জন্য আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো ক্ষত।
কোপা আমেরিকার জোড়া ফাইনাল বিপর্যয় (২০১৫ ও ২০১৬): বিশ্বকাপের সেই ক্ষত দগদগে থাকতেই পর পর দুই বছর চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে টাইব্রেকারে হার। বিশেষ করে ২০১৬ সালে পেনাল্টি মিস করার পর মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টাইন ফ্যানবেজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও শূন্য হাতে ফেরা—ফুটবল ইতিহাসে কোনো শক্তিশালী দলের সমর্থকরা বোধহয় এতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাননি। ‘আর্জেন্টিনা শুধু ফাইনালে উঠে হারতেই জানে’—এমন নির্মম ট্রোল তখন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।
দুঃখের দিন ফুরালো: মারাকানাতেই শুরু হলো রাজত্ব
যে মারাকানায় ২০১৪ সালে কান্না দিয়ে গল্প শেষ হয়েছিল, ২০২১ সালে সেই মারাকানাতেই চাকা ঘোরে আর্জেন্টিনার ভাগ্যের। ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হয় আলবিসেলেস্তেদের এক নতুন যুগ। এরপর ২০২২ সালে কাতারের মরুভূমিতে ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে সোনালী বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন মেসি।
মাঠের সেই ধারাবাহিকতা আর সাফল্যের ক্ষুধা যে ২০২৬ সালেও বিন্দুমাত্র কমেনি, তার প্রমাণ মিলছে আমেরিকার মাটিতে চলমান বিশ্বকাপে।
২০২৬ বিশ্বকাপ: মেসির অতিমানবীয় ফর্ম ও রেকর্ডের মেলা
চলমান বিশ্বকাপে লিওনেল স্কালোনির দল খেলছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মতোই। নিজেদের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে মিশন শুরু করে তারা, যেখানে দেখা মেলে মেসির জাদুকরী হ্যাটট্রিকের।
সেই রাজকীয় ছন্দ ধরে রেখে ২২ জুন টেক্সাসের ডালাসে (এটিকেঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম) অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচেও ২-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচেও জোড়া গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন মেসি। আর এই জোড়া গোলের ওপর ভর করেই তিনি গড়েছেন এক অনন্য ইতিহাস। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসেকে (১৬ গোল) টপকে ১৮ গোল নিয়ে এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা লিওনেল মেসি। একই সাথে টুর্নামেন্টের গোল্ডেন বুটের রেসেও তিনি সবার আগে।
এক নজরে ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও মেসির তাণ্ডব:
প্রথম ম্যাচ: আলজেরিয়া ০-৩ আর্জেন্টিনা (মেসির হ্যাটট্রিক)
দ্বিতীয় ম্যাচ (২২ জুন): অস্ট্রিয়া ০-২ আর্জেন্টিনা (মেসির জোড়া গোল)
সর্বকালের সেরা রেকর্ড: ১৮ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মেসি।
কান্না থেকে কাব্যের রূপান্তর:
এক দশক আগে যে ফ্যানবেজটি প্রতিটি টুর্নামেন্টের শেষে ট্রল আর অপমানের শিকার হতো, আজ তারাই ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে ঈর্ষণীয় অবস্থানে। ব্রাজিল, জার্মানি বা ইতালির মতো পরাশক্তিরা যখন মাঠের পারফরম্যান্সে নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে, তখন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা কাটাচ্ছেন এক অবিশ্বাস্য সুন্দর ও নিরবচ্ছিন্ন উৎসবের সময়।
২০১৪ সালের সেই শূন্য দৃষ্টির মেসি আজ ১৮ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের রাজা। আর সে কারণেই, অতীতে যারা সবচেয়ে বেশি কেঁদেছিল, বুক ফুলিয়ে নিজেদের ‘বিশ্বসেরা’ দাবি করার এই পরম সুখ এখন কেবল তাদের ভাগ্যেই জুটেছে। কষ্টের রাত পেরিয়ে আর্জেন্টিনার ফ্যানবেজে এখন শুধুই সোনালী ভোরের আলো।
নোমান অরুপ 



















