বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াটাই তাদের জন্য হতে পারত ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের ছোট্ট একটি দেশ, আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা দশটি দ্বীপ—সেখান থেকে উঠে এসে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া কি কম বড় রূপকথা?
কিন্তু কাবো ভার্দে শুধু বিশ্বকাপে ওঠার গল্প লিখেই থামেনি। বিশ্বমঞ্চে পা রেখে তারা সেই গল্পকে ধীরে ধীরে রূপ দিচ্ছে এক মহাকাব্যে।
প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন। অভিজ্ঞতা, তারকাখ্যাতি কিংবা শক্তির বিচারে দুই দলের ব্যবধান ছিল বিশাল। অথচ মাঠের খেলায় সেই ব্যবধান প্রায় অদৃশ্য করে দেয় আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি।
স্পেনের একের পর এক আক্রমণের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। রক্ষণভাগের প্রতিটি খেলোয়াড় লড়েছেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। ফলাফল—গোলশূন্য ড্র। বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তির কাছ থেকে এক পয়েন্ট ছিনিয়ে নেয় কাবো ভার্দে।
অনেকে হয়তো তখনও ফলটিকে অঘটন কিংবা ভাগ্যের সহায়তা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে কাবো ভার্দে বুঝিয়ে দিয়েছে, স্পেনের বিপক্ষে পাওয়া ফল কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের শুরু থেকেই কাবো ভার্দের শরীরী ভাষা ছিল আত্মবিশ্বাসী। তারা শুধু রক্ষণ সামলানোর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামেনি; সুযোগ পেলেই আক্রমণে উঠেছে এবং প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে ফুটবল খেলেছে।
২১ মিনিটে আসে ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দূরপাল্লার ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত এক নিচু শটে বল জালে পাঠান কেভিন পিনা। বিশ্বকাপের মূল পর্বে এটিই ছিল কাবো ভার্দের ইতিহাসের প্রথম গোল।
গোলটি যেন শুধু স্কোরবোর্ডে একটি সংখ্যা ছিল না। আটলান্টিকের দশটি দ্বীপ, দেশের লাখো মানুষ এবং বহু বছর ধরে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখা একটি জাতির আবেগ এসে মিশেছিল সেই শটে।
তবে উরুগুয়ে দ্রুতই ম্যাচে ফিরে আসে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে পরপর দুই গোল করে তারা ম্যাচে ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। বিরতিতে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, অভিজ্ঞতার শক্তিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বুঝি নিজেদের হাতে নিয়ে ফেলেছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ার পর কাবো ভার্দে চাইলে রক্ষণাত্মক হয়ে যেতে পারত। ব্যবধান আর না বাড়িয়ে সম্মানজনকভাবে ম্যাচ শেষ করার চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু তারা বেছে নেয় সম্পূর্ণ বিপরীত পথ।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন হেলিও ভারেলা। মাঠে নামার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই তাঁর সামনে চলে আসে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়ার সুযোগ।
৬১ মিনিটে উরুগুয়ের রক্ষণের ভুলের সুযোগ নিয়ে দ্রুত বলের নিয়ন্ত্রণ নেন ভারেলা। গোলরক্ষককে পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে দেন তিনি।
স্কোরলাইন ২–২
গোলের পর সতীর্থদের ঘাড়ে উঠে দুই বাহুর পেশি দেখিয়ে উদ্যাপন করেন ভারেলা। সেই উদ্যাপন যেন বিশ্বকে একটি বার্তাই দিচ্ছিল—ছোট দেশ হতে পারি, কিন্তু সাহসে আমরা কারও চেয়ে ছোট নই।
ভারেলার গোলের পর কাবো ভার্দের খেলোয়াড়দের মধ্যে যে আবেগ দেখা যায়, তা ছিল বিশ্বকাপের সবচেয়ে মানবিক দৃশ্যগুলোর একটি। কারও চোখে পানি, কারও মুখে অবিশ্বাসের হাসি, আবার কারও শরীরী ভাষায় ছিল শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।
সমতায় ফেরার পরও কাবো ভার্দে নিজেদের পেনাল্টি বক্সে গুটিয়ে যায়নি। ম্যাচের বাকি সময়ে তারা উরুগুয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আক্রমণ করেছে, মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং সুযোগ পেলেই ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে চেয়েছে।
অন্যদিকে উরুগুয়ের প্রতিটি আক্রমণের সামনে তারা দাঁড়িয়েছে একটি সংঘবদ্ধ ইউনিট হিসেবে। একজন ভুল করলে আরেকজন এগিয়ে এসেছেন। রক্ষণ ভাঙার উপক্রম হলে আবারও ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ভোজিনিয়া।
ফুটবল ইতিহাসে দুইবার বিশ্বকাপ জেতা উরুগুয়ের বিপক্ষে কাবো ভার্দের খেলায় ছিল না কোনো অস্বাভাবিক নার্ভাসনেস। বরং তাদের প্রতিটি দৌড়, ট্যাকল ও আক্রমণে ছিল অদম্য বিশ্বাস—এই মঞ্চে তাদেরও সমান অধিকার রয়েছে।
শেষ বাঁশি বাজার পর উরুগুয়ের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের হতাশা ছিল স্পষ্ট। অন্যদিকে কাবো ভার্দের কাছে এই ড্র ছিল আরেকটি ঐতিহাসিক অর্জন। স্পেনের পর উরুগুয়ে—টানা দুই ম্যাচে দুই ফুটবল পরাশক্তিকে আটকে দিয়ে তারা এখন গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার বাস্তব স্বপ্ন দেখছে।
দুই ম্যাচ শেষে তাদের সামনে এখন সৌদি আরব। শেষ ম্যাচে জিততে পারলে কাবো ভার্দের সংগ্রহ দাঁড়াবে পাঁচ পয়েন্টে। একই সময়ে স্পেনের বিপক্ষে উরুগুয়ে পয়েন্ট হারালে গ্রুপের প্রথম দুই দলের একটি হয়ে পরের পর্বে যাওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে তাদের সামনে।
এমনকি অন্য ফল এলেও বিশ্বকাপের নতুন কাঠামোয় সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হয়ে পরবর্তী পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনাও খোলা থাকবে। অর্থাৎ রূপকথার গল্পটি এখনো শেষ হয়নি। বরং সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি হয়তো এখনো লেখা বাকি।
শেষ পর্যন্ত তারা নকআউট পর্বে যেতে পারুক বা না পারুক, বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচেই একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে—কাবো ভার্দে এবারের আসরের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পগুলোর একটি।
বিশ্বকাপ প্রায়ই বড় তারকা, ধনী ফুটবল ফেডারেশন এবং ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর গল্প বলে। কিন্তু মাঝেমধ্যে কোনো ছোট দেশ এসে মনে করিয়ে দেয়, ফুটবলের আসল সৌন্দর্য শুধু শক্তিশালীদের জয়ে নয়; অসম্ভবকে বিশ্বাস করার সাহসেও লুকিয়ে থাকে।
কাবো ভার্দে সেই সাহসের নাম।
দশটি দ্বীপ, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এবং সীমিত সামর্থ্যের একটি ফুটবল জাতি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলকে জানিয়ে দিয়েছে—নামের আকার দিয়ে মাঠের লড়াই নির্ধারিত হয় না।
মনে রেখো বিশ্ব, এটি ভোজিনিয়া, কেভিন পিনা ও হেলিও ভারেলাদের দেশ।
তারা বিশ্বকাপে শুধু নিজেদের চেনাতে আসেনি।
তারা ফুটবল খেলতে এসেছে।
সায়ন্তন ভট্টাচার্য 




















