ঢাকা ০৯:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কক্সবাজারের ভূমিহীনদের নিয়ে সংসদে এমপি কাজলের প্রশ্ন, জবাবে যা জানালেন ভূমিমন্ত্রী যুবদল নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ ছাত্রদল নেতার জেলায় চাহিদা ১২ লাখ, সরবরাহ ৪ লাখ লিটার : কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট শহরে ৬ ছিনতাইকারী গ্রেফতার অজ্ঞাত পরিচয়ে স্বপ্নচূড়ার সভাপতিকে হুমকি, থানায় জিডি র‍্যাবের অভিযান: উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিপুল অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার এপ্রিলে বাড়ছে না জ্বালানি তেলের দাম সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ দিন অনলাইনে ক্লাস নেয়া হবে রামুতে ২৩ পাহাড়খেকোর বিরুদ্ধে মামলা : স্কেভেটর-ডাম্পার জব্দ কক্সবাজারে হামের উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু, ভর্তি ১১৯ রামুতে বিজিবির অভিযান: ৯০ লাখ টাকার ইয়াবা উদ্ধার সারাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার টন মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব অনলাইন-অফলাইন সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে

জেলায় চাহিদা ১২ লাখ, সরবরাহ ৪ লাখ লিটার : কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট

কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের সংকট এখন আর কেবল একটি সরবরাহ সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দ্রুত রূপ নিচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সংকটে। জেলার শহর থেকে উপকূল, দ্বীপ থেকে সীমান্ত সবখানেই একই চিত্র। পাম্পে পাম্পে তেল নেই, কোথাও শূন্য মজুত, কোথাও দীর্ঘ লাইন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসায় থমকে যাচ্ছে পরিবহন, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মাছ ধরার ট্রলার, আর পর্যটননির্ভর শহরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

জেলা জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজারের ৯টি উপজেলায় ৩২টি স্থল পেট্রোল পাম্প ও ২১টি ভাসমান পাম্প রয়েছে। প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১২ লাখ লিটার জ্বালানির প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ লাখ লিটার। এই বিশাল ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার প্রধান তিন অর্থনৈতিক খাতে। পরিবহন, মৎস্য ও পর্যটনে।

সদরেই সংকটের বিস্ফোরণ :

কক্সবাজার সদর উপজেলার পাম্পগুলোতে সংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। কামিনী মোহন মহাজন অ্যান্ড ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনে অকটেনের মজুত মাত্র ১,৩৩১ লিটার, অথচ দৈনিক চাহিদা ৬,০০০ লিটার। পেট্রোলেও একই অবস্থা। ৭৫৯ লিটার মজুতের বিপরীতে চাহিদা ১,৪০০ লিটার। ডিজেলেও হাজার হাজার লিটারের ঘাটতি। হাজী আশরাফ আলী অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশন ও ক্যাপ্টেন কক্স ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র। বিশেষ করে বাস টার্মিনাল এলাকার পাম্পে সংকট পরিবহন খাতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দূরপাল্লার বাসগুলো নির্ধারিত সময় ছাড়তে পারছে না। অনেক বাস একাধিক পাম্প ঘুরেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না।

রবিবার সন্ধ্যায় শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি। কেউ এক ঘণ্টা, কেউ দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। কলাতলী এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, “দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার তেল পেয়েছি। এতে অফিসে যাওয়া-আসা চালানোই কঠিন।”

রামু ও ঈদগাঁওয়ে ‘অসাম্য’ বণ্টন :

রামু উপজেলার এরশাদ ফিলিং স্টেশনে অকটেনের মজুত মাত্র ১০৯ লিটার। যা গতকাল দিনের শুরুতেই শেষ হয়ে যায়। ডিজেলেও রয়েছে বড় ঘাটতি। তবে একই উপজেলায় কিছু পাম্পে তুলনামূলক বেশি মজুত থাকলেও সাধারণ ভোক্তারা সেই তেল পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

ঈদগাঁওয়ের চিত্র আরও বৈপরীত্যপূর্ণ। করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনে অকটেন একেবারেই নেই। অথচ চাহিদা ২,১০০ লিটার। অন্যদিকে কিছু পাম্পে ডিজেলের উদ্বৃত্ত রয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীন বণ্টনের কারণে কোথাও লম্বা লাইন, কোথাও অব্যবহৃত তেল। এই অদ্ভুত বাস্তবতা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চকরিয়ায় সরবরাহ বন্ধ, বেড়েছে চাপ :

চকরিয়ায় সংকট সবচেয়ে গভীর। শাহ আমির ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের ঘাটতি ৭,৫৭৫ লিটার। আর ছিদ্দিক আহমদ ফিলিং স্টেশনে ৯,৩৭৭ লিটার। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, আব্দুল মোনাফ সওদাগর ফিলিং স্টেশনে ২৭ মার্চ থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে আশপাশের পাম্পগুলোতে চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

টেকনাফে থমকে মৎস্য খাত :

উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফে ডিজেল সংকট সরাসরি আঘাত হেনেছে মৎস্য খাতে। নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের মজুত মাত্র ৫০০ লিটার। যেখানে দৈনিক চাহিদা ৪,০০০ লিটার। জেলেরা বলছেন, “তেল না থাকলে সাগরে যাব কীভাবে?” এই প্রশ্ন এখন তাদের নিত্য বাস্তবতা।

ডিজেল সংকটে জেলার প্রায় ৬ হাজার মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। বাঁকখালী নদীর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ট্রলার নোঙর করে রাখা। কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “যে তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে ১০-১২ কিলোমিটারের বেশি যাওয়া যায় না। অথচ মাছ ধরতে শত কিলোমিটার যেতে হয়।”

বেকার হয়ে পড়ছেন জেলেরা :

তেল সংকটে সাগরে যেতে না পেরে হাজার হাজার জেলে বেকার বসে আছেন। জেলে ইউনুস বলেন, “সাগরে না গেলে আয় নেই। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।” স্থানীয়দের মতে, কয়েক লাখ মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

নৌপথে স্থবিরতা :

জ্বালানি সংকটে কক্সবাজার-মহেশখালীসহ বিভিন্ন নৌরুটে স্পিডবোট চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ স্পিডবোট বন্ধ রয়েছে। পেকুয়া-কুতুবদিয়া ও টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটেও একই অবস্থা।

মহেশখালী স্পিডবোট মালিক সমিতির নেতা দিদারুল ইসলাম বলেন, “আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ পেট্রল দেওয়া হতো, এখন তা মিলছে না। ফলে অনেক বোট বন্ধ রাখতে হচ্ছে।”

পর্যটন শহরে চাপা আতঙ্ক :

দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারেও এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালাতে না পারায় হোটেল-রিসোর্টগুলোতে ভোগান্তি বাড়ছে। ঈদের ছুটিতে পর্যটকের চাপ থাকলেও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।

হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, “ডিজেল না থাকায় জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। এতে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে। যা পর্যটন খাতের জন্য বড় ধাক্কা।”

এদিকে যানবাহনের সংকটে পর্যটকদের দর্শনীয় স্থানে যাতায়াতেও বিঘ্ন ঘটছে। কিছু গাড়ি চললেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

‘কৃত্রিম সংকট’ অভিযোগে উত্তাপ :

এই সংকটের মাঝেই উঠছে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ। কিছু বোট মালিক ও চালক বলছেন, অতিরিক্ত দাম দিলে গোপনে তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়ছে।

যানবাহন চালকদের অভিযোগ, দাম বাড়ার গুজবে অনেক পাম্প মালিক তেল বিক্রিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

প্রশাসনের ব্যাখ্যা :

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে সারা দেশেই জ্বালানি সংকট চলছে। পাশাপাশি পাচার রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”

পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান পাম্পগুলোতে অভিযান জোরদার, মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সঠিক পরিমাপে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

কোস্টগার্ড ও বিজিবিও জানিয়েছে, জ্বালানি পাচার ঠেকাতে সমুদ্র ও সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের আশঙ্কা থাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

অবৈধ মজুদ ঠেকাতে পুলিশের কন্ট্রোলরুম :

জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট ও মজুদকরণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কক্সবাজার জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জেলা পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদের চেষ্টা করছে। এমন তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ সুপার জেলার সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদেরও এ বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ তেল মজুদের তথ্য থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা পুলিশের কন্ট্রোল রুমসহ সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মোবাইল নম্বরে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সামনে বড় ঝুঁকি :

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কক্সবাজারের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। কারণ, জেলার অর্থনীতি মূলত তিন খাতের ওপর নির্ভরশীল। পরিবহন, মৎস্য ও পর্যটন। এই তিন খাতই এখন জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত।

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, “দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বিশেষ করে উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় সংকট দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।”

জরুরি সমাধানের দাবি :

জেলে, পরিবহন মালিক, পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা কক্সবাজারে বিশেষ বিবেচনায় দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, পাম্পভিত্তিক বণ্টনে সমন্বয় আনা এবং কৃত্রিম সংকট রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কক্সবাজারের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো একে একে থমকে যাবে। যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, “কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের এই সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়। এটি একটি গভীরতর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ‘তেলের জন্য হাহাকার’ খুব শিগগিরই রূপ নিতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে। তাই দেশের পর্যটনকে প্রতিনিধিত্ব করা এ জেলায় বিশেষ সরবরাহ দিয়ে জ্বালানী তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হোক। ”

ট্যাগ :

কক্সবাজারের ভূমিহীনদের নিয়ে সংসদে এমপি কাজলের প্রশ্ন, জবাবে যা জানালেন ভূমিমন্ত্রী

জেলায় চাহিদা ১২ লাখ, সরবরাহ ৪ লাখ লিটার : কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট

আপডেট সময় : ০৮:১৪:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের সংকট এখন আর কেবল একটি সরবরাহ সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দ্রুত রূপ নিচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সংকটে। জেলার শহর থেকে উপকূল, দ্বীপ থেকে সীমান্ত সবখানেই একই চিত্র। পাম্পে পাম্পে তেল নেই, কোথাও শূন্য মজুত, কোথাও দীর্ঘ লাইন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসায় থমকে যাচ্ছে পরিবহন, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মাছ ধরার ট্রলার, আর পর্যটননির্ভর শহরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

জেলা জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজারের ৯টি উপজেলায় ৩২টি স্থল পেট্রোল পাম্প ও ২১টি ভাসমান পাম্প রয়েছে। প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১২ লাখ লিটার জ্বালানির প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ লাখ লিটার। এই বিশাল ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার প্রধান তিন অর্থনৈতিক খাতে। পরিবহন, মৎস্য ও পর্যটনে।

সদরেই সংকটের বিস্ফোরণ :

কক্সবাজার সদর উপজেলার পাম্পগুলোতে সংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। কামিনী মোহন মহাজন অ্যান্ড ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনে অকটেনের মজুত মাত্র ১,৩৩১ লিটার, অথচ দৈনিক চাহিদা ৬,০০০ লিটার। পেট্রোলেও একই অবস্থা। ৭৫৯ লিটার মজুতের বিপরীতে চাহিদা ১,৪০০ লিটার। ডিজেলেও হাজার হাজার লিটারের ঘাটতি। হাজী আশরাফ আলী অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশন ও ক্যাপ্টেন কক্স ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র। বিশেষ করে বাস টার্মিনাল এলাকার পাম্পে সংকট পরিবহন খাতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দূরপাল্লার বাসগুলো নির্ধারিত সময় ছাড়তে পারছে না। অনেক বাস একাধিক পাম্প ঘুরেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না।

রবিবার সন্ধ্যায় শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি। কেউ এক ঘণ্টা, কেউ দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। কলাতলী এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, “দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার তেল পেয়েছি। এতে অফিসে যাওয়া-আসা চালানোই কঠিন।”

রামু ও ঈদগাঁওয়ে ‘অসাম্য’ বণ্টন :

রামু উপজেলার এরশাদ ফিলিং স্টেশনে অকটেনের মজুত মাত্র ১০৯ লিটার। যা গতকাল দিনের শুরুতেই শেষ হয়ে যায়। ডিজেলেও রয়েছে বড় ঘাটতি। তবে একই উপজেলায় কিছু পাম্পে তুলনামূলক বেশি মজুত থাকলেও সাধারণ ভোক্তারা সেই তেল পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

ঈদগাঁওয়ের চিত্র আরও বৈপরীত্যপূর্ণ। করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনে অকটেন একেবারেই নেই। অথচ চাহিদা ২,১০০ লিটার। অন্যদিকে কিছু পাম্পে ডিজেলের উদ্বৃত্ত রয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীন বণ্টনের কারণে কোথাও লম্বা লাইন, কোথাও অব্যবহৃত তেল। এই অদ্ভুত বাস্তবতা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চকরিয়ায় সরবরাহ বন্ধ, বেড়েছে চাপ :

চকরিয়ায় সংকট সবচেয়ে গভীর। শাহ আমির ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের ঘাটতি ৭,৫৭৫ লিটার। আর ছিদ্দিক আহমদ ফিলিং স্টেশনে ৯,৩৭৭ লিটার। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, আব্দুল মোনাফ সওদাগর ফিলিং স্টেশনে ২৭ মার্চ থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে আশপাশের পাম্পগুলোতে চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

টেকনাফে থমকে মৎস্য খাত :

উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফে ডিজেল সংকট সরাসরি আঘাত হেনেছে মৎস্য খাতে। নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের মজুত মাত্র ৫০০ লিটার। যেখানে দৈনিক চাহিদা ৪,০০০ লিটার। জেলেরা বলছেন, “তেল না থাকলে সাগরে যাব কীভাবে?” এই প্রশ্ন এখন তাদের নিত্য বাস্তবতা।

ডিজেল সংকটে জেলার প্রায় ৬ হাজার মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। বাঁকখালী নদীর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ট্রলার নোঙর করে রাখা। কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “যে তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে ১০-১২ কিলোমিটারের বেশি যাওয়া যায় না। অথচ মাছ ধরতে শত কিলোমিটার যেতে হয়।”

বেকার হয়ে পড়ছেন জেলেরা :

তেল সংকটে সাগরে যেতে না পেরে হাজার হাজার জেলে বেকার বসে আছেন। জেলে ইউনুস বলেন, “সাগরে না গেলে আয় নেই। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।” স্থানীয়দের মতে, কয়েক লাখ মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

নৌপথে স্থবিরতা :

জ্বালানি সংকটে কক্সবাজার-মহেশখালীসহ বিভিন্ন নৌরুটে স্পিডবোট চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ স্পিডবোট বন্ধ রয়েছে। পেকুয়া-কুতুবদিয়া ও টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটেও একই অবস্থা।

মহেশখালী স্পিডবোট মালিক সমিতির নেতা দিদারুল ইসলাম বলেন, “আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ পেট্রল দেওয়া হতো, এখন তা মিলছে না। ফলে অনেক বোট বন্ধ রাখতে হচ্ছে।”

পর্যটন শহরে চাপা আতঙ্ক :

দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারেও এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালাতে না পারায় হোটেল-রিসোর্টগুলোতে ভোগান্তি বাড়ছে। ঈদের ছুটিতে পর্যটকের চাপ থাকলেও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।

হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, “ডিজেল না থাকায় জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। এতে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে। যা পর্যটন খাতের জন্য বড় ধাক্কা।”

এদিকে যানবাহনের সংকটে পর্যটকদের দর্শনীয় স্থানে যাতায়াতেও বিঘ্ন ঘটছে। কিছু গাড়ি চললেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

‘কৃত্রিম সংকট’ অভিযোগে উত্তাপ :

এই সংকটের মাঝেই উঠছে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ। কিছু বোট মালিক ও চালক বলছেন, অতিরিক্ত দাম দিলে গোপনে তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়ছে।

যানবাহন চালকদের অভিযোগ, দাম বাড়ার গুজবে অনেক পাম্প মালিক তেল বিক্রিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

প্রশাসনের ব্যাখ্যা :

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে সারা দেশেই জ্বালানি সংকট চলছে। পাশাপাশি পাচার রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”

পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান পাম্পগুলোতে অভিযান জোরদার, মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সঠিক পরিমাপে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

কোস্টগার্ড ও বিজিবিও জানিয়েছে, জ্বালানি পাচার ঠেকাতে সমুদ্র ও সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের আশঙ্কা থাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

অবৈধ মজুদ ঠেকাতে পুলিশের কন্ট্রোলরুম :

জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট ও মজুদকরণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কক্সবাজার জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জেলা পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদের চেষ্টা করছে। এমন তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ সুপার জেলার সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদেরও এ বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ তেল মজুদের তথ্য থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা পুলিশের কন্ট্রোল রুমসহ সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মোবাইল নম্বরে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সামনে বড় ঝুঁকি :

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কক্সবাজারের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। কারণ, জেলার অর্থনীতি মূলত তিন খাতের ওপর নির্ভরশীল। পরিবহন, মৎস্য ও পর্যটন। এই তিন খাতই এখন জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত।

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, “দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বিশেষ করে উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় সংকট দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।”

জরুরি সমাধানের দাবি :

জেলে, পরিবহন মালিক, পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা কক্সবাজারে বিশেষ বিবেচনায় দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, পাম্পভিত্তিক বণ্টনে সমন্বয় আনা এবং কৃত্রিম সংকট রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কক্সবাজারের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো একে একে থমকে যাবে। যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, “কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের এই সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়। এটি একটি গভীরতর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ‘তেলের জন্য হাহাকার’ খুব শিগগিরই রূপ নিতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে। তাই দেশের পর্যটনকে প্রতিনিধিত্ব করা এ জেলায় বিশেষ সরবরাহ দিয়ে জ্বালানী তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হোক। ”