বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। সামনে চায়ের ফ্লাক্স ও লাল বালতি এবং গলায় ঝুলছে একটি প্লেকার্ড যেখানে লেখা -‘ আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। চা খেয়ে আমাকে সহযোগিতা করুন। ‘ ষাটোর্ধ বয়সের এই মানুষটির নাম আবুল হোসেন।
বঙ্গোপসাগরের বুকে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে এই চা বিক্রেতা আবুল হোসেনের জন্ম, ৮ সদস্যদের পরিবার নিয়ে থাকেন দ্বীপের উত্তর পাড়ায়।স্থানীয় লোকজনের কাছে লেইট্যা নামে পরিচিত আবুল হোসেনের রুটি-রুজি একসময় চলতো সাগরে মাছ ধরে, কিন্তু বয়সের কারণে তিনি এখন বিকল্প হিসেবে চা বিক্রি করেন তাও পর্যটন মৌসুমের সীমিত সময়ে।
সরকারি বিধিনিষেধ ও প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত কারণে সেন্টমার্টিনের পর্যটক সমাগমের ব্যপ্তিকাল মাত্র দুই মাস, যখন দ্বীপবাসী কার্যত আয়ের সুযোগ পেয়ে থাকেন। আবুল হোসেনের মতে, ‘ চোখের পলকে খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যায় এই সময় এবং বছরের বাকি দশমাস কোনরকম কষ্টে দিনযাপন করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘ সৈকত ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করি, বয়স হয়েছে তবুও পরিবারের জন্য করতে হয়। এক কাপ চা ১০ টাকা করে বিক্রি করে আর কতইবা পায় তবুও পর্যটক আসলে যা আয় হয় তা দশমাসের জন্য জমিয়ে রাখি। গত সিজনে খুব কষ্ট হয়েছে বউয়ের দু-জোড়া সোনার কানফুল (স্বর্ণের দুল) ছিল সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছি।’
আবুল হোসেন জানান, আয়-উপার্জন করতে সক্ষম আবু বক্কর নামে বড় সন্তান থাকলেও তার নিজের পরিবার সামলে সে হিমশিম খায়। তিনি বলেন, ‘ বড় ছেলের পরিবারও বড় হচ্ছে, সে দরিয়ায় মাছ ধরে।এখন সেখানেও অনেক সমস্যা তাই টুরিস্ট আসলে সে টমটম (ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা) চালায় না হলে খাবে কি?।’
এই দৃশ্য শুধু আবুল হোসেন বা তার পরিবারের নয়, প্রায় দশ হাজার জনসংখ্যার দ্বীপে প্রতিটি ঘরে আছে দুর্দশার গল্প।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন,’ পর্যটন মৌসুমকাল ছোট হওয়ায় আমাদের জন্য জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়টা অন্তত ৫ মাস হলে অনেক ভালো হতো, জানিনা আগামীতে দ্বীপবাসীর জন্য কিরকম ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।’
গত ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে সরকার,কিন্তু সে মাসে রাত্রিযাপনের সুযোগ না থাকায় চলেনি কোন জাহাজ। চলতি মাসের প্রথম দিন ১ ডিসেম্বর থেকে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল শুরু করে যা চলবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘ মৌসুম শুরুর দিকে পর্যটক কম থাকলেও এখন কিছুটা বৃদ্ধি পাচ্ছে তবে সেটিও একটি সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় দ্বীপ ছেড়ে গিয়েছে অনেকে, আগে যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে যে পরিমাণ আয় হতো সেখানে বর্তমানে সেই পরিমাণ অর্ধেকের চেয়ে বেশি কমে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘ আমরাও চাই দ্বীপের পরিবেশ সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠুক, সরকারের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় ইতিবাচক। আমাদের অনুরোধ থাকবে পর্যটনকেন্দ্রিক যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যেন দ্বীপের বাসিন্দাদের প্রাধান্য দেওয়া হয় কারণ আমরা নানা সমস্যায় জর্জরিত।’ এদিকে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলেও ইতিমধ্যে জানুয়ারির ১১ তারিখ পর্যন্ত প্রায় অধিকাংশ টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে বলে জাহাজ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন সীক্রুজ ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর ঢাকাপোস্ট’কে বলেন, ‘শুরুর প্রথম দুই সপ্তাহে পর্যটকদের চাপ কম থাকলেও বিজয় দিবসসহ সরকারি ছুটি থাকায় তৃতীয় সপ্তাহে পর্যটকদের চাপ বেড়েছে। মাসের শেষ দিন পর্যন্ত সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। যেহেতু ২৫ ডিসেম্বরও সরকারি ছুটি রয়েছে, সেসময়ও পর্যটকদের চাপ থাকবে।’
গত ২২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেন্টমার্টিনের জীব বৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় ১২ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছে জেলাপ্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও তানজিলা তাসনিম বলেন, ‘ প্রতিদিন সেন্টমার্টিন সংশ্লিষ্ট সবকিছুই প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। অনিয়ম-জালিয়াতি লক্ষ্য করা গেলে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুরো মৌসুম জুড়েই আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: 














