সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতারের পর থেকে দুই মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং পরদিন আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ২০ ডিসেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই তিনি বন্দি।
গ্রেফতারের পর আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের করা মামলায় অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহবান জানিয়েছিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। দেশেও মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানিয়ে জামিন দাবি করেছে। তবে জামিন মেলেনি আনিস আলমগীরের।
গ্রেফতার ও মামলা
গত ১৪ ডিসেম্বর রাত ৮টার পর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। মধ্যরাতে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামে একটি সংগঠনের সদস্য আরিয়ান আহমেদ তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টের ষড়যন্ত্র এবং নিষিদ্ধ সংগঠনকে উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনে মামলা করেন। একই মামলায় অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, মারিয়া কিসপট্টা ও উপস্থাপক ইমতু রাতিশ ইমতিয়াজকেও আসামি করা হয়।
মামলার পরপরই আনিস আলমগীরকে গ্রেফতার করা হয় এবং আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দুদকের মামলা
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে থাকার মধ্যেই গত ১৫ জানুয়ারি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। তদন্ত কর্মকর্তা ২৫ জানুয়ারি তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন এবং ২৮ জানুয়ারি আদালত তাকে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখান।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আনিস আলমগীরের নামে ৪ কোটি ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৯ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার ঘোষিত বৈধ আয়ের পরিমাণ ৯৯ লাখ ৯ হাজার ৮৫১ টাকা। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার সম্পদ তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পরিবারের অভিযোগ
আনিস আলমগীরের স্ত্রী শাহনাজ চৌধুরী বলেন, “এটা যে মিথ্যা মামলা সেটা সবাই জানে। এর ভোগান্তি পরিবারকেই পোহাতে হচ্ছে।” তিনি দাবি করেন, স্বাধীন মত প্রকাশের কারণেই তার স্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আনিস আলমগীর কি টেরোরিস্ট? তিনি কি কোনও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন?”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের কারণে জামিন প্রক্রিয়ায় জটিলতা ছিল। এখন উচ্চ আদালতের শুনানির দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।
আইনজীবীদের বক্তব্য
তার আইনজীবী নাজনীন নাহার বলেন, “ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এটা খুব সাধারণ বিষয়। আইনজীবীর ত্রুটির কারণে কাগজ জমা দেওয়া হয়নি। গ্রেফতার না হলে সেটি জমা দেওয়া যেত।”
আরেক আইনজীবী তাসলিমা জাহান পপি বলেন, “সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে ধারায় মামলা হয়েছে, তা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি কোনও নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নন।” দুদকের মামলাকে তিনি হয়রানিমূলক বলেও দাবি করেন।
নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সেখানে জামিন শুনানির কথা রয়েছে। আইনজীবীদের আশা, শুনানিতে তিনি জামিন পেতে পারেন।
পেশাগত পরিচিতি ও বিতর্ক
আনিস আলমগীর ইরাক-ইরান যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের জন্য পরিচিতি পান। দৈনিক আজকের কাগজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে টেলিভিশন টকশো ও সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় ছিলেন তিনি।
এখন কী?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে জামিন পাবেন আনিস আলমগীর? আইনজীবীরা বলছেন, উচ্চ আদালতে শুনানির ফলের ওপরই নির্ভর করছে তার মুক্তি।
পরিবার আশাবাদী, শিগগিরই তিনি মুক্ত হবেন। আর সমালোচকদের মতে, এই মামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন নজর আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
টিটিএন ডেস্ক: 























