আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের সর্ব দক্ষিণের দুই সীমান্ত উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৪ আসনে এবার মুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে দুই বড় দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এর জেলা প্রধানের মধ্যে।
রোহিঙ্গা ইস্যু,সীমান্ত সহ নানা কারণে আলোচিত এই আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী।
আরো দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির নুর আহমদ আনোয়ারী, তিনি চার মেয়াদে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর স্ব-পদ থেকে পদত্যাগ করে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
প্রচারণার নির্ধারিত সময়ে দুই প্রার্থী সমানতালে মাঠে সরব থাকলেও ভোটারদের নজর কেড়েছেন তাদের চার হেভিওয়েট সমর্থক। সাধারণ ভোটারদের মতামত ও মাঠের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভোটের সমীকরণে এই চার সমর্থকের অবস্থান প্রভাব ফেলতে পারে।
জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবারের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার প্রতিবাদে আব্দুল্লাহর সমর্থকেরা টেকনাফে মশাল মিছিলও করেছেন। কিন্তু শাহজাহান চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধতা পাওয়ার পর দলের প্রার্থীর পক্ষে আব্দুল্লাহ প্রচারণায় অংশ নেন। আব্দুল্লাহর আপন ভাই জিয়াউর রহমান জিহাদ টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তিনিও ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন।
টেকনাফে আব্দুল্লাহর প্রভাব রয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগের আমলে তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। এছাড়াও সাংগঠনিক ভাবে টেকনাফে বিএনপির প্রায় প্রতিটি ইউনিটের কমিটিতে আব্দুল্লাহর অনুসারীরা রয়েছেন। ফলে বিদ্রোহ না করে আব্দুল্লাহ ধানের শীষের পক্ষে থাকায় স্বস্তিতে রয়েছেন শাহজাহান চৌধুরী।
আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি দলের কর্মী, আমার কাছে দল আগে। মনোনয়ন পাইনি তাতে দুঃখ নেই দিন শেষে ধানের শীষের বিজয়ই মুখ্য।জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস ভালো নয়, এখানে শাহজাহান চৌধুরী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। ‘
উখিয়ার রত্নাপালংয়ের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান খাইরুল আলম চৌধুরী দীর্ঘদিন পর বিএনপিতে ফিরেছেন। ২০১৬ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইউপি নির্বাচন করায় তাকে বহিষ্কার করা হয়, ১০ বছর পর গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি কক্সবাজার জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে পুনর্বহাল হন।
তবে আওয়ামীলীগের আমলে সাবেক সংসদ আব্দুর রহমান বদি ও তার স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন আক্তারের পক্ষে নির্বাচনে নৌকার জন্য খাইরুল আলম চৌধুরী প্রকাশ্যে কাজ করেছিলেন। রত্মাপালং ইউনিয়ন ছাড়াও উখিয়ার রাজনীতিতে খাইরুল আলম চৌধুরী পরিচিত নাম। তিনি শাহজাহান চৌধুরীর বিভিন্ন পথসভায় ধানের শীষের জন্য ভোট চেয়ে বক্তব্য রেখেছেন।
খাইরুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘ জনগণের স্বার্থে দল আওয়ামী লীগের হয়ে নয় তৎকালীন ব্যক্তি সংসদ সদস্যের পক্ষে (বদি) কাজ করেছিলাম, এতে করে আমার এলাকার জনগণই সেসময় উপকৃত হয়েছে। আমি বিএনপির লোক, শহীদ জিয়ার আদর্শের লোক।’
বিএনপি মতাদর্শী হলেও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে প্রচারণায় নেমে ভোটের মাঠে সাড়া ফেলেছেন পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী। টানা তিন মেয়াদে ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত গফুর উদ্দিন চৌধুরী গত ৪ ফেব্রুয়ারি থাইংখালী এলাকায় জামায়াত প্রার্থী আনোয়ারীকে সাথে নিয়ে মিছিল করে প্রকাশ্যে আসেন। ঐদিন তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী জামায়াতে যোগ দেন।
গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ আমি বিএনপির কর্মী, দল ত্যাগ করিনি। হ্যাইজাককারী ‘পারিবারিক বিএনপি’ এর বিপক্ষে গিয়ে আনোয়ারীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। তারা চাঁদাবাজি বন্ধ করেনি, জনগণ তাদের লাল কার্ড দেখিয়ে ন্যায়-ইনসাফের প্রতীক’কে জয়যুক্ত করবে।’
পেশায় ব্যবসায়ী ও টেকনাফে শিল্পপতি হিসেবে পরিচিত ইয়াহিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ইয়াহিয়া দাঁড়িপাল্লার জন্য ভোট চেয়ে প্রচারণা করেছেন। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে তার পুত্র তাহা ইয়াহিয়া জাতীয়পার্টির প্রার্থী এছাড়াও তিনি নিজেই ২০০৭ সালে ১/১১ এর কারণে বাতিল হওয়া নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। গত ৯ ফেব্রুয়ারি দাঁড়িপাল্লার পথসভায় তিনি সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির মুক্তি কামনা করেন।
ইয়াহিয়া বলেন, ‘উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অলিগলিতে যেখানে যাচ্ছি দাঁড়িপাল্লার বিজয় ধ্বনি শোনা যাচ্ছে । সাধারণ মানুষ প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা এবার গরীবের নেতা নুর আহমদ করার শপথ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারীকে এমপি হিসেবে নির্বাচিত নিয়েছেন। একজন সৎ ও ন্যায় পরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে আমরাও তাকে সমর্থন করছি। ‘
হ্নীলা এলাকার চায়ের দোকানদার মুস্তাফিজ আলম বলেন, ‘ আমরা ভোট দিতে যাবো এবার, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করব।এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন দুই বড় প্রার্থী ভালো তবে যেই আসুক আমাদের মতো সাধারণদের কথা ভাবুক সেটাই চাই।’
উখিয়ার কোটবাজারের বেসরকারি চাকুরিজীবী সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘ এবারের ভোট অন্যান্যবারের চেয়ে ব্যতিক্রম। বড়কোন সহিংসতা দেখিনি, আশা করি ভোটের পরও অবস্থা এমনি থাকবে।’
গত ৯ ফেব্রুয়ারি নিজেদের শেষ জনসভায় দুই প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী ও নুর আহমদ আনোয়ারী স্ব-স্ব প্রতীকের ভোট চেয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমানের সমসাময়িক রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত শাহজাহান চৌধুরী উখিয়ায় শেষ নির্বাচনি সভায় বলেছেন, ‘উখিয়া-টেকনাফের উন্নয়নে আমার জীবন উৎসর্গ করেছি, জীবনে এক টাকাও দুর্নীতি করিনি এবং কোনো মানুষের ক্ষতি করিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপনাদের সেবক হয়ে থাকতে চাই।’
ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে টেকনাফে শেষ জনসভায় আনোয়ারী বলেন, ‘আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিবেন, অতীতে উখিয়া-টেকনাফে যারা ক্ষমতায় এসেছে সবাই দুর্নীতি করেছে।’
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৭১ হাজার ৮২৫ জন। উখিয়া ও টেকনাফে মোট ১১৫টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণ শেষে এর মধ্যে ৪৯টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য বলছে , সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র আছে উখিয়ায়। উপজেলার ৫৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩২টিই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া টেকনাফে ৬১টি কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি।
এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৭১ হাজার
৮২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৮৯ হাজার
২৮২, নারী এক লাখ ৮২ হাজার ৫৫১ এবং
হিজড়া ছয়জন।
নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই আসন থেকে ত্রয়োদশ সংসদে কে প্রতিনিধিত্ব করবেন? এমনের প্রশ্নের জবাবের যথাযথ উত্তর হয়তো মিলবে ১২ই ফেব্রুয়ারির ভোট গণনা শেষে।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 






















