বহুদিনের নীরবতা ভেঙে আবারও মঞ্চনাটকে মুখর হলো কক্সবাজার। রাজনৈতিক–মানবিক নাটক ‘ভূমিসূত্র’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ফিরলো প্রাণচাঞ্চল্য। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরির শহীদ সুভাষ হলে নাটকটির দুটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়—সন্ধ্যা ৬টা ও ৭টা ৩০ মিনিটে।
এই নাটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কক্সবাজার জেলা সংসদের চার মাসব্যাপী নাট্য কর্মশালার সমাপ্তি ঘটে।
নাটকটি রচনা ও পরিকল্পনা করেছেন মো. ইমরান হোসেন ইমু। গল্পও তারই লেখা। প্রযোজনায় ছিল উদীচীর নাটক বিভাগ। মঞ্চসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন জীয়ন্ত রাজু, আলোকসজ্জায় মোহাম্মদ শাহেদ, আর সংগীত পরিচালনা করেন রিদিতা মায়িশা।
জমি, ক্ষমতা আর মানুষের মানসিকতার গল্প
‘ভূমিসূত্র’ একটি রাজনৈতিক-মানবিক নাটক। যেখানে জমি, ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের পাশাপাশি মানুষের মানসিকতার অবক্ষয়ের একটি নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। নাটকের গল্প আবর্তিত হয়েছে গ্রামের কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে ঘিরে—যারা জীবিকার মাঠে প্রবেশ করতে চাইলেই সামনে এসে দাঁড়ায় আইন, নিষেধাজ্ঞা ও নানা অদৃশ্য প্রাচীর।
নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন শিল্পী, যিনি পরিবার ও চারপাশের মানুষের দীর্ঘদিনের দমননীতি ও ক্ষমতার চক্রে ধীরে ধীরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। অন্যদিকে, গণমাধ্যমের বিকৃত উপস্থাপনায় সত্য ঢেকে যায় তথাকথিত “উন্নয়নের গল্পে”। ফলে বাস্তবতার কণ্ঠ আরও চাপা পড়ে অন্ধকারে।

‘মাটির আত্মা’
নির্দেশকের ভাবনায় ‘ভূমিসূত্র’ শুধু জমির সংকটের গল্প নয়—এটি মানুষের শিকড়, অহংকার, লোভ ও স্বপ্নের টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবি। এখানে মাটি যেন নিজেই কথা বলে। শোষণ, প্রতিবাদ, অসহায়ত্ব—সবকিছু তার বুকে জমা থাকে।
নাটকের প্রতিটি চরিত্রকে বাস্তব মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। চোখে ক্ষুধা, কণ্ঠে প্রতিবাদ আর ভেতরে চাপা কষ্ট—সব মিলিয়ে নাটকটি ‘মাটির আত্মা’কে সামনে এনে দাঁড় করায়। নির্দেশক মনে করিয়ে দেন, মাটি শুধু সম্পদ নয়; মাটি স্মৃতি, সম্পর্ক, অস্তিত্ব ও মানুষের বিবেক।

নির্দেশকের ভাবনা
নাটকটি নিয়ে নির্দেশক ইমরান হোসেন ইমু বলেন, “‘ভূমিসূত্র’ কেবল জমির সংকটের গল্প নয়। এটি মানুষের শিকড়, অহংকার, লোভ ও স্বপ্নের টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবি। এই নাটকে মাটি নিজেই কথা বলে তার বুকে জমা থাকে শোষণ, প্রতিরোধ ও অসহায়তার ইতিহাস।
“নাটকের প্রতিটি চরিত্রই বাস্তব মানুষের প্রতিচ্ছবি। কোরাসকে আমরা ‘মাটির আত্মা’ হিসেবে দেখিয়েছি যারা ঘটনার সাক্ষী, ইতিহাসের ধারক এবং ভবিষ্যতের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা।”

প্রযোজনার উদ্দেশ্য
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কক্সবাজার জেলা সংসদের সভাপতি আশুতোষ রুদ্র বলেন, “এই প্রযোজনা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি নাট্যচর্চার অংশ। কর্মশালার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মঞ্চের ভাষা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছি।”
দর্শকের আবেগ ও প্রত্যাশা
নাটক শেষে দর্শকদের মধ্যে ছিল স্পষ্ট আবেগ ও সন্তুষ্টি। পর্যটন শহরে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক দেখার দারুন একটা ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সেইসাথে দর্শকের ব্যাপক সাড়াও পাওয়া গেছে। অনেকেই বলেছেন, বহুদিন পর কক্সবাজারে এমন একটি চিন্তাশীল মঞ্চনাটক দেখতে পেরে তারা আনন্দিত। দর্শকদের প্রত্যাশা—মঞ্চনাটক হোক গণমানুষের কথা বলা শিল্প, যা সমাজের প্রশ্নগুলো সাহসের সঙ্গে তুলে ধরবে।
একজন দর্শক বলেন, “এ ধরনের নাটক আমাদের ভাবতে শেখায়। কক্সবাজারে নিয়মিত মঞ্চনাটক হওয়া দরকার।”
আরেকজনের কণ্ঠে প্রত্যাশা, “নাটক হোক মানুষের, গণমানুষের।”
‘ভূমিসূত্র’ শুধু একটি নাটক নয়।এটি কক্সবাজারের মঞ্চসংস্কৃতির ফেরার বার্তা,মানুষের সঙ্গে মাটির সম্পর্কের এক কাব্যিক কিন্তু নির্মম দলিল।
আফজারা রিয়া : 
























