ভোটের পর এখন নতুন মন্ত্রিসভার অপেক্ষা। গেজেট জারির পর শপথ নেবেন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এরপর শুরু হবে নতুন সরকারে গঠনের প্রক্রিয়া। আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ৩০০ আসনের বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে এককভাবে সরকার গঠন করতে কমপক্ষে ১৫১ আসন প্রয়োজন। দুই শতাধিক আসন পাওয়ায় বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ হবে। পরবর্তী দু-দিনের মধ্যে মন্ত্রিসভার শপথের মধ্যমে গঠিত হবে নতুন সরকার।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা পর্যন্ত নির্বাচনে ২৯৯টির মধ্যে ২৯৭টি আসনের ফলাফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২১২টি আসনে বিএনপি জোট, ৭৭টিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জোট, সাতটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও একটিতে অন্যান্যরা বিজয়ী হয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথের পর পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে দলনেতা নির্বাচিত হবেন। তারপর দলের নেতা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বলবেন, আমাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে সংসদে। তখন রাষ্ট্রপতিকে তিনি সরকারপ্রধান করার অনুরোধ করবেন। তার পরেই গঠিত হবে নতুন সরকার।
নির্বাচনে সর্বোচ্চ আসনপ্রাপ্ত বিএনপির সংসদ নেতা হবেন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন- এটি অনেকটাই নিশ্চিত।
নির্বাচনে দল হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা সংসদে কী হবে, সেটাও পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত হবে। তবে জামায়াত সংসদে প্রধান বিরোধী দল হবে, এটাও অনেকটা নিশ্চিত।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেওয়া শেষে আইন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানান, সর্বোচ্চ ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গণভোট ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে এবং ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠন করা হবে।
সংসদ সদস্যদের শপথ
সংবিধানের ১৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদায়ী স্পিকার নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন। ১৪৮ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের মনোনীত কোনো ব্যক্তির কাছেও এমপিরা শপথ নিতে পারবেন।
সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর বিষয়ে সংবিধানে ১৪৮ এর ২(ক) ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’
কিন্তু, অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। বিগত সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু এখন কারাগারে আছেন। যদিও তিনি এখনও পদত্যাগ করেননি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সংসদ সদস্যের শপথ পাঠ করানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই নতুন সংসদ সদস্যদের কে শপথ পাঠ করাবেন এই বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচিত নতুন সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি হিসবে প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিতে পারেন। এছাড়া নির্বাচিত হওয়ার তিনদিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে শপথ নিতে পারেন।
তবে নতুন এমপিরা কার কাছে শপথ নেবেন তা সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত বলেও জানিয়েছিলেন আইন উপদেষ্টা।
ওই দিনই নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ কার্যত শূন্য থাকায় সংবিধানের বিশেষ বিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়াতে পারবেন।
এরপর গঠিত হবে নতুন মন্ত্রিসভা
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্ধারণ করবেন, সেভাবে অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন।
তবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংখ্যার কমপক্ষে দশভাগের নয় ভাগ সংসদ-সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগ পাবেন। সর্বোচ্চ দশভাগের এক ভাগ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভার সদস্য মনোনীত (টেকনোক্র্যাট) হতে পারবেন বলে সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর শপথ পড়াবেন। এরপর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি। শপথের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দপ্তর বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিলে তারাই হবে দেশের নতুন সরকার। শপথ নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার বহাল থাকবে। নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিলে আগের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও বঙ্গভবন নতুন মন্ত্রিসভার শপথ এবং মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। শপথ অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গভবনে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ।
নতুন মন্ত্রিসভা কত সদস্যবিশিষ্ট হবে সেটা নির্ধারণ করবে নির্বাচনে বিজয়ী দল। তবে বিগত সরকারগুলোর মতো মন্ত্রিসভার আকার ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর (পরিবহন পুল) সূত্রে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য গাড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সর্বোচ্চ সংখ্যা ৫০ জন ধরে নিয়ে গাড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সূত্র:জাগোনিউজ
টিটিএন ডেস্ক: 






















