বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এক বিরল বাস্তবতার সাক্ষী। দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষ-প্রাধান্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে টানা প্রায় ৩৬ বছর দেশের শীর্ষ নির্বাহী পদে ছিলেন দুই নারী নেতা— বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি বহুবার প্রশংসিত হয়েছে; নারী নেতৃত্বের প্রতীকী সাফল্য হিসেবে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— শীর্ষ নেতৃত্বে নারী থাকা কি রাজনৈতিক কাঠামোর সর্বস্তরে নারীর ক্ষমতায়নে রূপান্তরিত হয়েছে? নাকি এটি মূলত প্রতীকী উপস্থিতি, যেখানে কাঠামোগত রূপান্তর সীমিত? ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ভোটার হিসেবে সমতা, প্রার্থী হিসেবে বৈষম্য
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩৭ জন। এর মধ্যে— নারী ভোটার: ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন (৪৯.২৭%)। পুরুষ ভোটার: ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন (৫০.৭২%)। তৃতীয় লিঙ্গ: ১,২৩৪ জন।
অর্থাৎ ভোটার হিসেবে নারীর অংশ প্রায় সমান। কিন্তু প্রার্থী তালিকায় সেই সমতা দৃশ্যমান নয়।এবারের নির্বাচনে যাচাইযোগ্য মোট প্রার্থী ১,৯৮১ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৭৬–৮৪ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩.৮% থেকে ৪.২%।
ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী— কিন্তু প্রার্থী মাত্র চার শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কাঠামোগত বৈষম্যকে স্পষ্ট করে।
বিজয়ে সীমিত উপস্থিতি
চূড়ান্ত ফলাফলে জয়ী নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭ জন। তাদের অনেকেই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবার বা দলীয় কাঠামোর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত। স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর বিজয় প্রায় অনুপস্থিত।
অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর প্রবেশ এখনও ব্যতিক্রমধর্মী; ধারাবাহিক প্রবণতা হয়ে ওঠেনি।দলীয় কাঠামো ও মনোনয়ন সংকট
নির্বাচনে অংশ নেয় প্রায় ৫১টি রাজনৈতিক দল। বৃহৎ দলগুলোতেও নারীর মনোনয়ন সীমিত। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ক্ষেত্রে নারীর মনোনয়ন শূন্য।
নির্বাচন কমিশনের পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্তে ৫% নারী প্রার্থিতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। ভবিষ্যতে ৩৩% নারী প্রার্থিতা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে প্রমাণিত হয়—কাঠামোগত কোটা ছাড়া দলীয় পর্যায়ে নারী মনোনয়ন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি পায় না।
শেখ হাসিনা: সামাজিক উন্নয়ন বনাম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তার, উপবৃত্তি কর্মসূচি, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি চাকরিতে নারী কোটা— এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও সংশোধনের মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকার, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্তি নীতিগত স্বীকৃতি পায়। তবে সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সত্ত্বেও জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়েনি। দলীয় মনোনয়ন কাঠামোও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীবান্ধব হয়নি।
বেগম খালেদা জিয়া: শিক্ষা ও আইনি কাঠামোর উদ্যোগ
বেগম খালেদা জিয়া-এর মেয়াদে ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচি, প্রাথমিক শিক্ষা বৃত্তি, নারী শিক্ষক নিয়োগে কোটা—এসব উদ্যোগ মেয়েদের শিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। উচ্চশিক্ষায় গার্লস ক্যাডেট কলেজ, মহিলা পলিটেকনিক, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
২০০২ সালে এসিড অপরাধ দমন আইন প্রণয়ন নারীর নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু এসব উদ্যোগ রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণে সমানতালে রূপান্তরিত হয়নি। শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার উন্নয়ন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে সরাসরি প্রতিফলিত হয়নি।
প্রতীকী নেতৃত্ব বনাম কাঠামোগত ক্ষমতায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বাস্তবতা “টপ-ডাউন নারী নেতৃত্ব”—শীর্ষে নারী, কিন্তু তৃণমূল ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে পুরুষ-প্রাধান্য অব্যাহত।
প্রধান বাধাগুলো হলো:
দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পুরুষকেন্দ্রিকতা। অর্থনৈতিক ও নির্বাচনী ব্যয়ের চাপ। রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি। সামাজিক মানসিকতা ও লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত।
ফলে নারীর রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
২০২৬ ও নতুন প্রত্যাশা
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নারীর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উদ্যোক্তা সহায়তা ও নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়— এই প্রতিশ্রুতি কি বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে রূপ নেবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ন্যূনতম ২০–৩০% বাধ্যতামূলক নারী প্রার্থিতা, দলীয় নেতৃত্বে কোটা, এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া বৈষম্য কমানো কঠিন।
বাংলাদেশে প্রায় ৩৬ বছর নারী প্রধানমন্ত্রী থাকার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে—বিশেষত সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বে—নারীরা এখনও প্রান্তিক। প্রতীকী সাফল্য কাঠামোগত রূপান্তরের সমান নয়।
অতএব, প্রশ্নটি এখন আর শুধু অতীতের মূল্যায়ন নয়—ভবিষ্যতের রূপরেখা। নারী নেতৃত্বের ঐতিহ্য কি রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীরে পৌঁছাবে, নাকি তা শীর্ষ পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে—সেটিই আগামী সময়ের প্রধান পরীক্ষার বিষয়।।
সূত্র: বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
টিটিএন ডেস্ক: 


















