দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এর ফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০ বছর পর আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় যাচ্ছে দলটি।
জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫১টি আসনে বিজয়ী হলেই গঠন করা যায় সরকার। অর্থাৎ মোট আসনের ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ আসনে জয়ী হলেই সরকার গঠন করতে পারে একটি দল। সেই হিসাবে ৬৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ আসনে বিশাল জয় নিয়েই এবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এছাড়া, প্রার্থীর মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত থাকা শেরপুর-৩ আসন, এবং আদালতের নির্দেশে ফলাফল স্থগিত থাকা চট্টগ্রাম ২ ও ৪ আসনের ফল এলে বাড়তে পারে বিএনপির সংসদ সদস্য সংখ্যা। এর সঙ্গে রয়েছে তাদের মিত্রদের আরও ৩টি আসন।
সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। সেই সময় তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছিল। ওই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক জয় পেয়েছিল ১৯৫টি আসনে। আর এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীই ছিল বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে ভোটের মাঠে বিএনপির কাছে বিশাল ব্যবধানে হেরেছে জামায়াত। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয় পেয়েছে ৬৮টি আসনে। মিত্ররা পেয়েছে আরও ৯টি আসন।
কোন দল কত আসনে জয়ী
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ এবারের নির্বাচনে অংশ নেয় মোট ৫০টি দল। কার্যক্রম স্থগিত করায় নির্বাচনে ছিল না দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ করেছে ইসি। শেরপুর-৩ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে এই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এই আসনের তফসিল পুনরায় ঘোষণা করা হবে। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বিকালে ২৯৭ আসনের ফলাফল ঘোষণা করেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, ২৯৭ আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন।
জুলাই আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট করে অংশ নেয় নির্বাচনে। এই দলটি ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে।
দুটি আসনে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা। একটি করে আসনে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, খেলাফতে মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৭টি আসনে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপির সর্বশেষ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতায় আসে ২০০১ সালে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে এই দলটিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি।
সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলের চেয়ারপারসনের পদটি শূন্য হয়। এরপর তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে অনুমোদন দেয় দলের স্থায়ী কমিটি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। প্রথমবার দলের নেতৃত্ব পেয়েই বিপুল ব্যবধানে জয় এনে দিলেন তারেক রহমান।
পরিসংখ্যানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। এই প্রার্থীদের মধ্যে পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৬ জন। যার মধ্যে বিভিন্ন দলের ১ হাজার ৬৯২ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫৩ জন। আর নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। যাদের মধ্যে বিভিন্ন দলের ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র ২০ জন।
দলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি প্রার্থী দিয়েছে ২৯১টি আসনে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ২৫৮। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২২৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া জাতীয় পার্টি (জাপা) ১৯৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ২৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবারের নির্বাচনে।
ইসি জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এছাড়া এবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে একইদিন অনুষ্ঠিত হয় গণভোটও। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং ‘না’ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। ২৯৯ আসনে গণভোট প্রদানের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ।
জয়ী হয়েছেন ৭ নারী প্রার্থী
এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন ৭ জন। তাদের মধ্যে বিএনপি থেকে ছয় জন নারী প্রার্থী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাচ্ছেন। একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
নির্বাচনে জয়ী নারী প্রার্থীরা হলেন—মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতা, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ কামাল, নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন পুতুল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
বিজয়ের শুভেচ্ছায় ভাসছে বিএনপি
বিপুল ব্যবধানে বিজয়ের পর বিভিন্ন দেশের উষ্ণ শুভেচ্ছায় ভাসছে বিএনপি।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ইতোমধ্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের (আইএনসি) সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। এছাড়াও শুভেচ্ছা জানিয়েছে মার্কিন এবং চীনা দূতাবাস।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুভেচ্ছা জানানো দেশ ও বিশ্বনেতাদের তালিকা বাড়ছে।
সূত্র:বাংলা ট্রিবিউন
টিটিএন ডেস্ক: 

















