Monday, March 4, 2024
spot_img

বিজিপি বিজিবির রাজ্জাক-মিজানের সাথে কি আচরণ করেছিলো?

আব্দুর রশিদ মানিক :

মিয়ানমারে জান্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষ চলছে। সংঘর্ষের মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিজিপির (বর্ডার গার্ড পুলিশ) ৩৩০ সদস্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের রেখেছে আরাম-আয়েশে। দেওয়া হচ্ছে ভালো খাবার-দাবার।

কিন্তু ইতিহাস কি বলে? বিজিপি হলে কি বিজিবিকে এমন আশ্রয় দিত? তারজন্য ফিরতে হবে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে। প্রথমে জানি ২০১৫ সালের ঘটনা।

২০১৫ সালের ১৭ ই জুন বুধবার। ভোরে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল নায়েক আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে টেকনাফের নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিল। তারা বাংলাদেশের জলসীমায় মাদক চোরাচালান সন্দেহে দুটি নৌকায় তল্লাশি করছিল। এ সময় মিয়ানমারের রইগ্যাদং ক্যাম্পের বিজিপির সদস্যরা একটি ট্রলারে করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে বিজিপির সদস্যদের বহনকারী ট্রলারটি বিজিবির টহল নৌযানের কাছে এসে থামে। বিজিপির ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তারা নায়েক রাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেয়। বিজিবির অন্য সদস্যরা এতে বাধা দিলে তারা গুলি করলে সিপাহি বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। পরে বিজিপির ট্রলারটিতে রাজ্জাককে তুলে নিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে যায়। অপহরণের পর বিজিপির সদস্যরা রাজ্জাককে শারীরিক নির্যাতন করে, এতে তার নাকে গুরুতরভাবে জখম হয়।

পরদিন বৃহস্পতিবার আপত্তিকর তিনটি ছবি প্রকাশ করা হয় মিয়ানমার থেকে। ছবিগুলোতে দেখা যায়, আবদুর রাজ্জাককে হাতকড়া পরানো। মুখে আঘাতের চিহ্ন। তার নাকের কাছে ক্ষত এবং শুকিয়ে কালচে হয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। তার পরনে লুঙ্গি, গায়ে বিজিবি’র ইউনিফর্ম। সামনে কিছু অস্ত্র রাখা। মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ ছবিগুলো প্রকাশ করেছে বলে তখন জানিয়েছিলো বিবিসি বাংলা। বিজিবি সদস্যের ছবি ফেসবুকে প্রকাশের পর বাংলাদেশব্যাপী ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠেছিলো। অনেকেই ছবিগুলো ফেসবুকে শেয়ার করছিলো। তারা আটক সীমান্তরক্ষীর সঙ্গে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ তুলছিলো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে।

অপহরণের করে নির্যাতনের ৯ দিন পর নানা কূটনীতিক তৎপরতায় তাকে বাংলাদেশের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পিলখানা হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো সে সময়।

২০১৪ সালের ২৮ মে বান্দরবানের পানছড়ি সীমান্তে কোন রকম উস্কানি ছাড়াই বিজিবি সদস্যদের ওপর গুলি চালায় বিজিপি। সে সময় নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায় তারা। পরে তাকে হত্যা করা হয়। অবশ্য ওই ঘটনায় দু’দিন সীমান্তে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে নায়েক মিজানুর রহমানের লাশ হস্তান্তর করে বিজিপি।

এদিকে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আশ্রয় নেয়া নিয়ে কক্সবাজারেরও চলছে নানান আলোচনা-সমালোচনা। একটি পক্ষ মানবিক দিক থেকে আশ্রয় দেওয়ায় বিজিবিকে বাহবা দিলেও আরেকটি পক্ষ বলছে তারাতো বিজিবি এবং বাংলাদেশিদের সাথে এরকম আচরণ করে না।

যেখান থেকে নায়েক রাজ্জাককে তুলে নিয়েগিয়েছিলো ওই এলাকার বাসিন্দা আরশাদুর রহমান একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এজন্য বিষয়টি আবারো আলোচনায়।

আরশাদুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমি উনাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম। তখন বাজারে কিংবা নাফনদীর সাইডে দেখা হলে সালাম দিতাম। চাকরির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতাম। তখন সহকর্মীদের বাঁচাতে গিয়ে নিজে অপহরণের স্বীকার হন। তিন দিন পর ফেসবুকে ছবি দেয়। কি মর্মান্তিক অবস্থা। একজন সীমান্ত রক্ষীর নাক ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে, হাতে হাতকড়া পরিয়েছে। তিনদিন ধরে টর্চার করছে। সেই দিনের এই রক্তমাখা ছবি ছিল লজ্জার। তারা ১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমের সাথেও অত্যাচার চালিয়েছিলো। আমরা তাদের জামাই আদর করছি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

আমিনা খাতুন (৩৪) তার ৩ সন্তানকে নিয়ে বিজিপির সদস্যদের দেখতে এসেছেন ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ওরা হলে বিজিবিকে খেয়ে ফেলতো আমরা যে সেবা দিচ্ছি! রোহিঙ্গাদের যেভাবে নির্যাতন করেছে। বিজিবি এবং বাংলাদেশিদের কিভাবে নির্যাতন করেছে এসব আমাদের মনে আছে। তাই এদের একটু দেখতে আসলাম।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, চোখের বদলে চোখ নিতে থাকলে পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাবে। ওরা যে রকম আচরণ করেছে আমরা জাতি হিসেবে তাদের সাথে এরকম আচরণ করতে পারি না। ওরা বাংলাদেশের কাছে আশ্রয় চেয়েছে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। আন্তর্জাতিক আইনেও এমন বিধান আছে। বাংলাদেশ সঠিক একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কূটনৈতিক ভাবে বাংলাদেশ এটার সমাধান করবে। তাদের ফেরত পাঠাবে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

You cannot copy content of this page