Thursday, February 29, 2024
spot_img

মহেশখালীতে অবৈধ কমিটিকে দেয়া হচ্ছে বিদ্যালয় পরিচালনার প্রশিক্ষণ

কাব্য সৌরভ, মহেশখালী-

মহেশখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়াদোত্তীর্ণ অবৈধ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্সি (ইউএসএআইডি) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পৃক্তকরণে এসএমসি’র ভূমিকা বিষয়ক ‘এসো শিখি’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে। অভিযোগ উঠেছে মহেশখালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ভবরঞ্জন দাস ও ইউএসএআইডি’র এসো শিখি প্রকল্পের মহেশখালী উপজেলা সমন্বয়ক আব্দুস সালাম যোগসাজশে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়াদোত্তীর্ণ অবৈধ পরিচালনা কমিটিকে এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

এসো শিখি প্রকল্পের প্রশিক্ষণের তথ্যমতে এই প্রকল্পে প্রধান শিক্ষক হিসেবে একমাত্র প্রশিক্ষক আদিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিঠুন ভট্টাচার্য্য। জানাযায়, স্বয়ং তার বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দু’বছর আগে। তিঁনি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবার প্রশিক্ষকও। এ-নিয়ে বিভিন্ন মহলে সৃষ্টি হয়েছে নানা সমালোচনা।

এছাড়াও এই প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষক হিসেবে রয়েছে
লাল মোহাম্মদ সিকদার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহেনুর আলম শিবলী, কালারমারছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ওসমান সরওয়ার, টাইমবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুলাল কান্তি দে, নোনাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খাইরুল ইসলাম, ঘটিভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন, ফকিরাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কহিনুর জান্নাত, মহেশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তৌহিদা আক্তার।

মহেশখালীতে একই দিনে ৪টি ভেন্যুতে ৩টি সরকারি বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে।

জানাযায়, গত ২১ জানুয়ারি (রবিবার) চুপিসারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত ও ইউএসএআইডি’র এসো শিখি প্রকল্পের কান্ট্রি ডিরেক্টর আরড্রেক ওয়ারিক এমন অনিয়মের প্রশিক্ষণ পরিদর্শন করে গেছেন।

সূত্র বলছে, মহেশখালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ভবরঞ্জন দাস, ইউএসইআইডি’র মহেশখালী উপজেলা এসো শিখি প্রকল্পের সমন্বয়ক আব্দুস সালাম, উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসার শামসুল আলম, আদিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিঠুন ভট্টাচার্য্য যোগসাজশে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ কমিটির তথ্য গোপন করে এই প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন।

মহেশখালী উপজেলায় ৭০ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। অনুসন্ধানের তথ্য বলছে ৪২ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। তারমধ্যে মহেশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আদিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুন্সিরডেইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফকিরাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালালিয়াকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বানিয়াকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিজ্জির পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছোট মহেশখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘটিভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মগরিয়াকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউসুফনুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এড.মওদুদ আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমিনা মওদুদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কমপক্ষে ২৫ টি বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে ৫ থেকে ১০ বছরেরও অধিক আগে।

কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৬ নভেম্বর ২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপনের তথ্যেমতে আগের সব কমিটি বিলুপ্ত এবং নতুন কমিটির গঠনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে বিদ্যালয় পরিচালনার ১১ জন বিশিষ্ট ওই কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। এবং কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৬ মাস পূর্বে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা অফিসারের অনুমতিক্রমে নতুন কমিটি গঠনের সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে পূর্বের কমিটিকে স্বপদে বহাল রেখেছেন বলে অভিযোগ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে। শুধু তাই-নয়, ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও মেয়াদোর্ত্তীণ সভাপতির যোগসাজশে শিক্ষা অফিসার মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন করা থেকে বিরত থেকে অর্থ আত্মসাতে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৯ সালে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নীতিমালা অনুযায়ী সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ পাস করা হলেও ২০১৯ সালের পূর্বে গঠিত কমিটির সভাপতিসহ সদস্যরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করায় বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিচালনায় তেমন কোন পরিবর্তন এবং মানোন্নয়ন হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল।

সচেতন মহলের অভিমত, বিদ্যালয়ের উন্নয়নে মেয়াদোত্তীর্ণ অবৈধ কমিটিকে দেওয়া এই প্রশিক্ষণ জনসম্পৃক্তের চেয়ে বরং প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনবিদ্বেষ সৃষ্টি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিয়মনীতি না থাকলে এটি ব্যক্তি আধিপত্যের খোলসে আটকা পড়বে বলে মনে করেন তারা।

এসব মেয়াদোর্ত্তীণ কমিটির প্রশিক্ষণের আয়োজন করা ইউএসএআইডি এসো শিখি প্রকল্পের মহেশখালী উপজেলা সমন্বয়ক আব্দু সালামের প্রত্যক্ষ যোগসাজেশ রয়েছে বলেও জানা যায়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মনগড়া প্রশিক্ষণ প্রার্থীর তালিকা বানিয়ে (৬ জনকে প্রশিক্ষণ, ১১ জনের নামে তালিকা প্রস্তুতকরণ) ঢাকা অফিসে পাঠানো এবং প্রশিক্ষণের অর্থ ও প্রশিক্ষণ সামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ১১ জনের প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৬/৭ জন করে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এখানে অনেক প্রধান শিক্ষক স্বজনপ্রীতির আশ্রয়ও নিয়েছেন। কিন্তু টিএ প্রদানের জন্য নিজেদের ভিন্ন-ভিন্ন মোবাইল নং দিয়ে ১১ জনের তালিকা পাঠানো হচ্ছে এই প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় ঢাকা অফিসে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আরেক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসার ভবরঞ্জন দাসের যোগসাজশে এসব হচ্ছে। তিনি মহেশখালীতে কিছু প্রধান শিক্ষক নিয়ে নিজের একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। সে-সব শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত তো দূরের কথা কোনো নিয়মনীতিই তোয়াক্কা করেন না। ভবরঞ্জনের কাছে অভিযোগ করলে উল্টো নিজেকেই বিপদে পড়তে হয়।

এ-বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ইউএসএআইডি এসো শিখি প্রকল্পের মহেশখালী উপজেলা সমন্বয়ক আব্দুস সালাম বলেন ‘আমাকে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ভবরঞ্জন দাস যে কমিটি দিয়েছে তাদেরকে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’ সে পরিচালনা কমিটির বৈধ কিংবা মেয়াদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিঁনি বলেন ‘উপজেলা শিক্ষা অফিসার বৈধ বলেছেন।’ পরে যাচাই-বাছাই না করার বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন। অর্থ ও প্রশিক্ষণের উপকরণসামগ্রী আত্মাসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি দেখা করতে বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়, মহেশখালী উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসার শামসুল আলমের সাথে। তিনি বলেন ‘এই বিষয়ে টিও স্যার বলতে পারবেন, মগরিয়াকাটাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আমি টিও স্যারকে বলেছিলাম।’

আরেক সহকারী শিক্ষা অফিসার ওমর ফারুকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি মহেশখালীতে, যদি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি প্রশিক্ষণের আওতায় আসে সে-সব কমিটির বিষয়ে টিও স্যারের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।

পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় মহেশখালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ভবরঞ্জন দাসের সাথে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্পর্কে কেউ লিখিত অভিযোগ করে নাই, করলে সেটা বিবেচনা করা হবে। অভিযোগ ছাড়া ৩ বছর অতিবাহিত হওয়া মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি গুলো পূর্ণগঠনের দায়িত্ব উপজেলা শিক্ষা অফিসের কিনা জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যান। যে-সকল প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে সে-সকল কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষক যোগসাজশে উপজেলা শিক্ষা অফিস আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। এসো শিখি প্রকল্পের প্রশিক্ষণের অনিয়ম, নিজেদের মতো প্রশিক্ষণ প্রার্থীর উপস্থিতি সীট ঢাকা পাঠিয়ে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যস্ততার অজুহাতে তিনি তার অফিসে যোগাযোগ করতে বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

ইউএসএআইডি’র এসো শিখি প্রকল্প কক্সবাজারের মহেশখালী, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার ২৭০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩,০০০ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করছে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

You cannot copy content of this page