Sunday, February 25, 2024

জালিয়াতি করে প্রধান শিক্ষক হলেন লিটন

কাব্য সৌরভ, মহেশখালী

মহেশখালীর শাপলাপুরের জলেয়ারমার ঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক কাইচার লিটনের বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাইচার লিটন ২০১৮ সালে চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী তাসনিয়ার উত্তরপত্র জালিয়াতি করে ফেল করিয়েছিলেন।

যা তদন্ত প্রতিবেদনে প্রমাণিত হলে পরে তাসনিয়া গোল্ডেন এ প্লাস পান আর শাস্তি হয় কাইচার লিটনের। এই ঘটনা জেলাসহ পুরো দেশে আলোচিত হলে সমালোচিত হন তৎকালীন বিএমচর উচ্চ বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।

পরে ২০২৩ সালে মহেশখালীর শাপলাপুরের তৎকালীন জেএমঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় বর্তমান জলেয়ারমার ঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ফরিদুল আলমের যোগসাজশে নিয়োগ জালিয়াতি করে তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।

টিটিএনের অনুসন্ধানে উঠে আসে জালিয়াতির ফিরিস্তি। জলেয়ারমার ঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ফরিদুল আলমের যোগসাজশে অনুষ্ঠিত ওই নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদনকারী দেখানো হয় পাঁচ জন। তারা হলেন, চকরিয়া লক্ষ্যাচর এলাকার সোহাইবুল ইসলাম, চকরিয়া পূর্ব বড় ভেওলার কাইচার লিটন, চকরিয়া পালাকাটা এলাকার নুরুল হুদা, চকরিয়া বিএমচর এলাকার রুহুল কাদের, চকরিয়া বরইতলী এলাকার ফরহাদুল ইসলাম। আবেদনকারী পাঁচজনই ছিলেন চকরিয়ার।

কিন্তু পরীক্ষার অংশগ্রহণকারী সীটে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে নুরুল হুদা ও ফরহাদুল ইসলামকে। উপস্থিত দেখানো তিনজনের মধ্যে ছিলেন সোহাইবুল ইসলাম, অভিযুক্ত কাইচার লিটন এবং রহুল কাদের।

এই বিষয়ে জানতে টিটিএন প্রতিবেদক সোহাইবুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা সম্পর্কে তিনি জানেন না এবং তিনি এই পরীক্ষায় অংশ নেননি। তিনি এও বলেন, তার জন্মসন ১৯৬৪ সালে। এখন তিনি অবসরে যাওয়ার সময়।

এরপর যোগাযোগ করা হয় রুহুল কাদেরের সাথে। তিনি বলেন, ‘জেএমঘাট কিংবা মহেশখালীর কোনো প্রতিষ্ঠানে আমি আবেদনও করিনি এবং কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় অংশও নেইনি।’

এখন প্রশ্ন হলো এই নিয়োগ পরীক্ষা কোথায়, কিভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে?

কিন্তু টিটিএনের হাতে আসা ওই নিয়োগ পরীক্ষার এডেনডেন্স সীটে দেখা যায় সীলসহ স্বাক্ষর রয়েছে তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) নাছির উদ্দিন, ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে গোলাম মোস্তফা, প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ফরিদুল আলম, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দীন, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আব্দুস ছালাম।

এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফরিদুল আলমের সাথে। তিনি বলেন, ‘জেলা শিক্ষা অফিস সব জানে, তাদের ম্যানেজ করে এই নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে।’

কখন কোথায় পরীক্ষা হয়েছে অংশগ্রহণকারী কারা ছিলেন এই বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদুল আলম বিরক্তের স্বরে বলেন, ‘ভাই স্কুলটা আমি নিজের ক্যাশ টাকায় করেছি, লাভের আশায় করেছি। দীর্ঘদিন যাবৎ এখানে টাকা খরচ করেছি।’ পরে তিনি প্রতিবেদককে সরাসরি দেখা করতে বলেন।

এদিকে তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) নাছির উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ওই নিয়োগ পরীক্ষায় ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে স্বাক্ষরকারী গোলাম মোস্তফার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘জলেয়ারমার ঘাট কিংবা জেএমঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় আমি দায়িত্বরত ছিলাম না। আমি মহেশখালীতে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলাম সেটা হলো মহেশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, সেখানে যিঁনি নিয়োগ পেয়েছিলেন তিঁনি ওই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন পরে নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি পূর্ণ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।’ নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উনার নাম গিয়াস উদ্দিন।’

এরপর যোগাযোগ করা হয় নিয়োগ প্যানেলের অপর স্বাক্ষরকারি তৎকালীন ওই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দীনের সাথে। তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষা ঠিক কত তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছে তা স্মরণে নেই।’ কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মহেশখালীতে। মহেশখালী কোথায় জানতে চাইলে বলেন মহেশখালী ইউএনও অফিসে।’

অথচ মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কার্যালয়ে এসংক্রান্ত কোনো নিয়োগ পরীক্ষা হয়নি যার এখতিয়ারও নেই।

এবিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক কাইচার লিটনের বক্তব্য পুরো উল্টো। তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।’

ওই নিয়োগ এটেনডেন্স সীটে অপর স্বাক্ষরকারি আব্দুস ছালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলের অভিভাবক সদস্য, আমাকে ডেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর দিতে বললে আমি স্বাক্ষর করেছি। বাকি কিছু জানিনা।’

এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, ‘পুরো জালিয়াতির মাধ্যমে সভাপতি ফরিদুল আলম ও কাইচার লিটন তৎকালীন শিক্ষা অফিসারকে ম্যানেজ করে এই নিয়োগ জালিয়াতি করেছে। আপনি দেখবেন, আবেদনকারী সবাই চকরিয়ার, অন্য এলাকায় কি প্রধান শিক্ষক যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক আবেদন করেনি। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় এই নিয়োগ জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছে।

• সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাইচার লিটনের বিরুদ্ধে ভূয়া শিক্ষকদের এমপিও করণের অভিযোগ

কাইচার লিটন গেলো বছর (২০২৩) ১৯ জানুয়ারি জলেয়ারমার ঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। কিন্তু তার দু’দিন আগে ১৭ জানুয়ারি শিক্ষাবোর্ড থেকে জলেয়ারমার ঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাইচার লিটনের নাম উল্লেখিত শীতকালীন ক্রীড়ার চিঠি ইস্যু হয়েছে। যোগদানের আগেই সরকারি নথিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্তির এই চিঠি ইস্যুর তথ্য ঘাটতে গিয়ে দেখা যায় কাইচার লিটন চট্টগ্রাম ও ঢাকার একটি সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। যারা শিক্ষকদের তথ্য গোপন করে মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ে এমপিও করান।

কাইচার লিটন জলেয়ারমার ঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদানের পর প্রকৃত শিক্ষকদের বাদ দিয়ে ৮ জন সহকারী শিক্ষক ও ৬ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিকে এমপিও করায় অভিযোগটি আরো স্পষ্ট হয়ে যায়।

অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক কাইচার লিটনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তার নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং কোথায় এই নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি টিটিএনকে বলেন, ‘গেলো বছরের ২ জানুয়ারি চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী অংশগ্রহণকারী কারা ছিলো জানতে চাইলে তিনি চকরিয়া লক্ষ্যাচর এলাকার সোহাইবুল ইসলাম ও চকরিয়া বিএমচর এলাকার রুহুল কাদেরের নাম উল্লেখ করেন।

কিন্তু ওই দুজন শিক্ষকই টিটিএনকে জানিয়েছেন পরীক্ষায় অংশ নেননি বলে। কাইচার লিটন বলেছেন তার নিয়োগ পরীক্ষা চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষার উপস্থিতি তালিকায় স্বাক্ষরকারি ওই প্রতিষ্ঠানের তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দিন বলেছেন মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে।

দুটো ভিন্ন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে প্রতিষ্ঠান সভাপতি ফরিদুল আলম বলতে পারবেন, আমি একজন নিয়োগ প্রত্যাশী ছিলাম তখন।’

করোনাকালীন সময়ে সরকারি অনুদানের ৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ এর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনা ২০২০- ২০২১ সালে হয়েছে তার নিয়োগ হয়েছে ২০২৩ সালে, এমন কোনো অনুদানের বিষয়ে তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি বলতে পারবেন।

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভূয়া শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি অসত্য বলে দাবি করেন।

• কাইচার লিটনের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র জালিয়াতির অভিযোগ

২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী তাওরিন তাসনিয়া তাসফি নামের এক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে ওই মেধাবী শিক্ষার্থীকে ফেল করিয়েছিলেন কাইচার লিটন। তৎকালিন কাইচার লিটন চকরিয়া বিএমচর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। এসময় ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্ব পান চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই কেন্দ্রের ২১ নং কক্ষের পরীক্ষার্থী ছিলেন তাসনিয়া। অন্য কক্ষ থেকে এসে তাসনিয়াকে প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করতেন কাইচার লিটন, পরে ওই উত্তর অপর কক্ষের শিক্ষার্থীকে বলে দিতেন। এভাবে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকলে বিরক্তির কথা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাসনিয়া। এতে প্রতিশোধ পরায়ণ হয় লিটন।

পরে বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি বিষয়ের পরীক্ষার দিন তাসনিয়ার কক্ষে দায়িত্ব পান কাইচার লিটন। এদিন পরীক্ষা শেষে তাসনিয়ার উত্তরপত্র (ওএমআর) আড়াল করে অপর একটি উত্তর পত্রে ৩০ টি প্রশ্নের ২০ টি ভরাট করে জালিয়াতির মাধ্যমে তা তাসনিয়ার খাতার সাথে সংযুক্ত করে দেয় লিটন। সব বিষয়ে তাসনিয়ার এপ্লাস আসলেও ফেল আসে বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি বিষয়ে। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর ফলাফল নিয়ে তার শিক্ষক পিতা ও তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ তাসনিয়ার পরিবার হতাশ হোন। পরে ফলাফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করলে শিক্ষাবোর্ড তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কাইচার লিটনের জালিয়াতি প্রমাণিত হয় আর পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফলে গোল্ডেন এপ্লাস পান তাসনিয়া। বর্তমানে তাসনিয়া মেডিকেলে পড়ছে। এসময় দেশজুড়ে সমালোচিত হোন শিক্ষক কাইচার লিটন।

জলেয়ারমার ঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের এমন লাগামহীন দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিষয়ে স্থানীয়রা বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানুষ গড়ার আড়ালে দুর্নীতি ও জালিয়াতির আতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এসব দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দাবী তাদের।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

You cannot copy content of this page