Monday, February 26, 2024

গরু পাচারে ব্যবহার হচ্ছে বিদেশি রিভলবার : ছিনতাইয়ে একে ৪৭

শাহিদ মোস্তফা শাহিদ, ঈদগাঁও :

মায়ানমার থেকে চোরাই পথে আনা গরু পাচার কাজে ব্যবহার হচ্ছে দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র। আর এ কাজে শক্তি প্রদর্শনে ব্যবহার করা হচ্ছে অর্ধ শতাধিক চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে। যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ভূরি ভূরি মামলা,অভিযোগ। ভাড়াটিয়া হিসেবে এসব সন্ত্রাসীদের উত্থান ঘটাচ্ছেন গরু পাচার সিন্ডিকেটের মুলহোতারা। পাহাড়ি জনপদের এসব সন্ত্রাসীদের আস্তানা গহীন পাহাড়ে হওয়ায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের আটকে অভিযান চালায় না বলে জানান সচেতন নাগরিক সমাজ। যার কারণে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে গরু পাচার, মাদক, খুন, ডাকাতি,ছিনতাই, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বান্দরবানের বাইশারী ইউনিয়নের আলিক্ষ্যং ১নং মৌজা,৫৩-৫৪ সীমান্ত পিলার এলাকার সাথে মায়ানমারের যোগাযোগ সহজ।গহীন ভিতরে হওয়ায় মায়ানমার থেকে গরু, মাদক, অস্ত্র,সিগারেট, বার্মিজ পণ্য সহজেই দেশে প্রবেশ করছে। সেখানে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গের মতো কাটা পাহাড় , মুলত সেই সুড়ঙ্গ কাটা পাহাড় দিয়েই প্রবেশ করে গরু, মাদক, অস্ত্র, সিগারেট।

সীমান্ত বাহিনীর নিয়মিত টহল না থাকায় মায়ানমার থেকে সে দেশের বাসিন্দা আনোয়ার সাদেক ও রবি নামের দুই চোরাকারবারী দলের সদস্য প্রতিনিয়ত গরু পাচার সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এদেশে গরু পাচার করে আসছে। তাদের হয়ে এ দেশে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সারাদেশে গরু পাচার করে আসছে।এবার এসব গরু বিক্রি বা হাটে তুললে নেতা, পুলিশ, সাংবাদিক, সীমান্ত বাহিনীর কতিপয় সদস্যদের দিতে হয় চাঁদা।

সূত্রে জানা যায়, বান্দরবানের লামা, আলীকদম, নাইক্যংছড়ি, কক্সবাজারের রামু, চকরিয়া, ঈদগাঁও উপজেলার কয়েকজন জড়িত রয়েছে। ২০ জানুয়ারি শনিবার দুপুরে গরু পাচার দলের তিন সদস্যকে বিদেশি রিভলবার, দেশীয় তৈরী অস্ত্র, কার্তুজসহ আটক করে ঈদগড় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা।

আটককৃতরা ঈদগাঁওয়ের কালির ছড়া এলাকার জিকু। জিকু স্থানীয় কয়েকজন ক্ষমতাসীন দলের নেতার আশ্রয় প্রশ্রয়ে ডাকাতি, অপহরণ, গরু পাচার, অস্ত্র ব্যবসা, ভাড়াতে মাস্তান হিসেবে জমি দখল করতো বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন। ধৃত অপর দুইজন চকরিয়ার সালা উদ্দিন ও মেহেদী হাসান অস্ত্র হাতে নিয়ে ট্রাক যোগে গরু গুলো কালির ছড়া এলাকা থেকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতো বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। তাদের আটকের পর বেরিয়ে আসে গরু পাচারের নেপথ্যে কারা রয়েছে।

জানা গেছে, গেল ৯ জানুয়ারি রামু উপজেলার গর্জনিয়া গহীন অরণ্যে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশান (আরএসও’র) সদস্যদের সঙ্গে ব্যাপক গুলাগুলির ঘটনা ঘটে। ঐদিন ঈদগড় ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আহমেদ হোসেন বিপ্লবের কাছে মায়ানমার থেকে আসা ৪২ টি গরু আরএসও সদস্যদের কাছ থেকে লুট করে নেয় শাহিন বাহিনী। ঘটনার সময় আরএসও’র সঙ্গে গুলি বর্ষনের সময় শাহিন বাহিনীর প্রধান শাহিনের একে ৪৭ অস্ত্রের ম্যাগজিন হারিয়ে যায়। জানতে পেরে ঐ সিন্ডিকেটের প্রধান আহমেদ হোসেন বিপ্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণ দাবি করে শাহিন। ততক্ষণে বিজিবি অভিযান চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং ১৩ গরু জব্দ করে নিয়ে যায়।ঐ ঘটনায় শনিবারে আটককৃত জিয়াউল হক জিকু, সালা উদ্দিন, মেহেদী হাসানকে দেখতে পেয়েছে স্থানীয়রা। তারা ভারি অস্ত্র নিয়ে সেদিন শাহিনের আশপাশে অবস্থান করছিল।

শাহিনের সঙ্গে ঈদগাঁও কালির ছড়া এলাকার ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন গরু পাচারকারী সিন্ডিকেটের দহরমমহরম সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

স্থানীয়রা জানান, গর্জনিয়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহিন বাহিনী কাছে বেশ কয়েকটি একে ৪৭ সহ দেশী বিদেশি ভারি অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র নিয়ে প্রভাব বিস্তার করে গরু পাচার এবং ক্ষেত্র বিশেষ ছিনতাই করে বসে।শাহিনের সঙ্গে রয়েছে গর্জনিয়ার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জুনায়েদ প্রকাশ জুনাইক্কা, গোরা মিয়াসহ কয়েক ডজন সন্ত্রাসী। স্থানীয়রা আরো জানান, এসব প্রভাবশালীরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আনা গরু গুলো তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে কাজে লাগিয়েছে বাইশারী, ঈদগড়, ঈদগাঁওয়ের কালির ছড়া, ভূতিয়া পাড়া, রশিদ নগর ,গর্জনিয়ার অর্ধ শতাধিক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের।

এসব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের রয়েছে আলাদা আলাদা বাহিনী। তারা স্থান বেদে গরু পৌঁছে দেয় প্রতি গরু ৫শ ১ হাজার, দুই হাজার টাকার চুক্তির মাধ্যমে।সম্প্রতি সড়কে বিজিবি, পুলিশের টহল জোরদার না থাকায় গরু পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করছেন সচেতন মহল। সরকারের শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এসব গরু পাচার সিন্ডিকেটের সদস্য ও অস্ত্রধারীরা এতই শক্তিশালী কেউ তাদের বাধা দেওয়ার সাহস করে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে যেসব সড়ক দিয়ে গরু পাচার হয় সেগুলো হলো রশিদ নগর ইউনিয়নের হামির পাড়া, নাদেরুজ্জামান হাই স্কলের পাশের সড়ক, কালির ছড়া ভুতিয়া পাড়া, শিয়া পাড়া সড়ক।

এসব সড়ক দিয়ে পাহাড়ি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি কাজে লাগানো হয়েছে স্থানীয় ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের। সিন্ডিকেটের সদস্যের নির্দেশ মতে তারা এসব গরু টাকার বিনিময়ে পৌঁছে দিচ্ছে তাদের গন্তব্যেস্থলে। বিভিন্ন হাট বাজার থেকে অধিক টাকায় রশিদ সংগ্রহ করে গরু গুলো বৈধ প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠে হাট বাজারের অসাধু ইজারাদাররা। যার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা গরু জব্দ করলেও আইনী ম্যারপ্যাচে আটকে যেতে হয় তাদের। পুলিশ, বিজিবি মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে গরু জব্দ করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় পাচারকারীরা।

স্থানীয়রা জানান, প্রথমে গরু গুলো বাইশারী এবং ঈদগড়ে নিয়ে আসে পাচারকারীরা।সেখান থেকে ঈদগড়ের পাহাড় দিয়ে চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কে পৌঁছে দেয় বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী। গর্জনিয়ার শাহিন ডাকাতসহ প্রায় শতাধিক চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় অহরহ মামলা রয়েছে। তারা একাধিক বার জেলে গিয়ে জামিনে মুক্ত হয়ে বেপরোয়া হয়ে গেছে । ঈদগাঁও ঈদগড় সড়কে ডাকাতি, অপহরণ পূর্বক মুক্তিপণের পাশাপাশি গরু পাচার কাজেও সমানভাবে কাজ করে আসছে তারা।

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে পাহাড় বেয়ে নিরাপত্তা বলয় জোরদার করে গরু গুলো ঈদগাঁও এবং রামু, চকরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেয়। এসব গরু পাচার করতে গিয়ে প্রায় সময় ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা। গরু লুট, লেনদেনে বাড়ছে বিভক্তি। যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে খুনের মতো ঘটনা। সচেতন সমাজের দাবি ট্রাস্কফোর্স গঠন করে এসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযান চালিয়ে আইনের আওতায় আনা। নয় তো দেশ এবং সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তারা আরও বলেন, যে সব সন্ত্রাসীদের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে সেগুলো উদ্ধার করা না গেলে ভবিষ্যতের জন্য কাল হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ (প্রশাসন) রফিকুল ইসলাম বলেন,’ চোরাকারবারি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ বরাবরই জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল রয়েছে। সম্প্রতি ঈদগড় ইউনিয়ন থেকে বিদেশি রিভলবারসহ ৩ চোরাকারবারি দলের সদস্যদের আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, রিমান্ডের আবেদন করে অস্ত্রের রহস্য উদঘাটন করা হবে। এলাকার সচেতন লোকজন এবং মিডিয়া কর্মীদের দেওয়া তথ্য গুলো যাচাই-বাছাই করে সন্ত্রাসী, চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান শুরু হবে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

তিনি আরো বলেন, চোরাকারবারি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তথ্য পুলিশসহ অন্যন্যা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সংগ্রহ করেছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অস্ত্রবাজি, প্রদর্শন, পাচারের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালিয়ে আটক করা হবে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

You cannot copy content of this page