Saturday, March 2, 2024
spot_img

কবর দেওয়ার ৬ মাস পর মিলল বেওয়ারিশ লাশের ওয়ারিশ!

সাইফুল আফ্রিদি :

রাতের আঁধার পেরিয়ে প্রতিদিন সকাল হয় সাহাব মিয়ার। প্রতিটি সকালই তার ছেলে হারানোর শূন্যতায় হাহাকার। প্রতিবেশী কয়েক বাড়ি ছাড়া আর সব বাড়ির ছেলেরা আছে পাড়াজুড়ে। তাই সন্তান শূন্যতা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।

ছেলের কথা মনে পড়লেই চাপা কান্নায় চোখের জলে বুক ভাসান সাহাব মিয়া। গত ৯ টি মাস অসহ্য শোক স্মৃতির বোঝা বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি । তার শোকের এক প্রান্তে ছেলে হারানোর বেদনা আর অন্য প্রান্তে ছেলেকে নিজের হাতে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে না পারার আক্ষেপ । দীর্ঘ ৯ মাস পর ছেলের ডিএনএ টেস্টের ফল এসেছে। এটিই যেন গত কয়েক মাসের মধ্যে বেদনার মাঝেও আক্ষেপ ঘুচলো।

খবরটি পেয়ে যেনো সন্তান ফিরে পেল সাহাব মিয়া! মহেশখালী থেকে কক্সবাজার ছুটে এলেন ছেলে সাইফুল্লাহকে দেখতে। তবে শেষ দেখাটা জীবিত বা মৃত ছেলের সাথে নয়; ছেলের কবরের সাথে শোকে পাথর হয়ে যাওয়া একজন বাবার দেখা। ছেলেকে দাফনের ৬ মাস পর বাবা জানতে পারলো বেওয়ারিশ মরদেহটিই তার প্রিয় পুত্র সাইফুল্লাহর।

বাবার সাথে ছেলের অন্তিম মিলনটা যে এমন হবে তা কখনো ভাবেননি সাহাব মিয়া। জল ছলছল চোখে তাই সাহাব মিয়া ছেলের কবর জিয়ারত করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেন কবরের মাটি। কবরটিকে ছেলের মতো করে দুই হাতে পরম মায়ায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তিনি। আর দু’চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছে জল ।

ছেলের কবর জিয়ারত করতে আসলে কথা হয় সাহাব মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, ‘বাবা হয়ে ছেলের এমন করুণ মৃত্যু মানতে পারছি না। শেষবার যখন ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আসছিলো তখন আমি ও আমার স্ত্রী খুব করে বলেছিলাম, ডিএনএ মিলে না যাওয়া ওই লাশটি আমাদেরই ছেলে সাইফুল্লাহর। ছেলের মরদেহটি ঘরে নিয়ে নিজ হাতে দাফন করতে অনেক কাকুতি মিনতিও করেছিলাম। তবে ডিএনএ মিল না পাওয়া ও একাধিক দাবিদার থাকায় লাশটি হস্তান্তর করেনি প্রশাসন।’

ছেলেকে হারিয়ে মরদেহটি পেয়েও না পাওয়ার আক্ষেপ সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে বলে আফসোস করেন সাহাব মিয়া।

গত ৯ ই জুলাই ছেলের মরদেহ নিতে এসে ফেরত যেতে হয়েছে সাহাব মিয়া ও তার স্ত্রীকে। ডিএনএ শনাক্ত না হওয়া মরদেহটি পরনের কাপড় দেখে চিহ্নিত করেছিলো সাইফুল্লাহর মা। এটি আমার ‘ছেলের লাশ’ এটি আমার ‘ছেলের লাশ’ বলে দাবি করলেও মরদেহটি ওয়ারিশের স্বীকৃতি পায়নি সেদিন। এরপরই বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহটিকে দাফন করা হয় কক্সবাজার আনজুমান-ই -মফিদুল কবরস্থানে।

সাহাব মিয়া জানান, জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে সাগরে ১০ হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে ফোন করে জানান তার ছেলের ডিএনএ মিলেছে। হম্বিতম্বি হয়ে ছুটে এলেন কক্সবাজার শহরে। । গত ৮ টি মাস ছেলের পরিচয় পাচ্ছিলেন না। না ছেলে, না কবর কোনটিই তার চেনা নাই। তাই জিয়ারত করা হয়ে উঠেনি ছেলের কবরটিও। কক্সবাজারে এসেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুর্জয় বিশ্বাসের সাথে দেখা করেই তিনি ছুটে গেলেন ছেলের কবরটি দেখতে।

সাহাব মিয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, “ছেলের লাশটিও দেখিনি, কবরটিও চিনি না। মসজিদের ইমামের সহায়তায় কবরটি চিহ্নিত করি।” এরপর অশ্রুসিক্ত নয়নে কবরটি জিয়ারত করে ছেলের জন্য প্রাণভরে দোয়া করেন তিনি।

এছাড়াও এমন মৃত্যু যেন অন্য কোন বাবার সন্তানের না হয় সেই কামনাও করেন তিনি। বিষয়টি জানতে চেয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুর্জয় বিশ্বাসকে ফোন দিলে তিনি জানান, ডিএনএ টেস্ট মিলে যাওয়ায় তার পরিবারকে ফোন দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তারা এসে আনজুমান মফিদুলে কবর জিয়ারত করেন।

গেলো বছর ২৩ এপ্রিল কক্সবাজারের নাজিরারটেকে ভেসে আসা একটি ট্রলার থেকে ১০ টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৪ টি মরদেহের একাধিক দাবিদার থাকায় ডিএনএ টেস্টে পাঠানো হয়। তার মধ্যে মহেশখালী শাপলাপুরের ২ জনের মরদেহ পাওয়া যায়নি এখনো।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

You cannot copy content of this page