Thursday, April 18, 2024

চৌফলদন্ডী ঘাটে সক্রিয় পাচারকারি চক্র: মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে মানব, মিয়ানমারে তেল

টিটিএন রিপোর্ট :

কক্সবাজার সদর উপজেলালদন্ডী ব্রীজ এখন মানব ও জ্বালানী তেল পাচারকারীদের নিরাপদ জোনে পরিনত হয়েছে। গেল ২ মাসে চৌফলদন্ডী ব্রীজ ঘাট এলাকা থেকে ফিশিং ট্রলারে করে সাগর পথে মালয়েশিয়া গেছে অন্তত ৫শ শতাধিক লোক। একই সাথে বেড়েছে তেল পাচারের মতো ঘটনা। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। গত ২ জানুয়ারি গভীর রাতে ব্রীজ ঘাট এলাকায় মানবপাচারের উদ্দেশ্যে নোঙর করা
একটি ট্রলারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঐ ট্রলারে মায়ানমারের পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ করা প্রায় দেড় হাজার লিটার অকটেন পুড়ে যায়। এ ঘটনায় ট্রলারে থাকা ৩ শ্রমিক ও একজন মেকানিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা শেখ হাসিনা বার্ণ ইউনিটে মৃত্যু বরণ করেন। তারা হলেন চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের দক্ষিণ পশ্চিম পাড়া এলাকার মৃত আবদু রাজ্জাকের ছেলে মেকানিক আবদুল হাকিম প্রকাশ ড্রাইভার, খুরুশকুল ইউনিয়নের হাটখোলা গ্রামের মৃত কবির আহমেদের ছেলে আবদুল করিম প্রকাশ কালু, অপরজনের বিস্তারিত তথ্য জানা না গেলেও নিহত আবদুল হাকিমের ছেলে আবদুল কাদের নিশ্চিত করেন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাবাসহ ৩ জন মারা গেছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ১০ লক্ষ টাকার অধিক বিনিয়োগ করেছে স্থানীয় তেলের পাম্প মালিক রেজাউল করিম সিকদার রেজা।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, তেল পাচারের ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক ক্ষতি পূরণ ও থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেছে তেলের পাম্প মালিক। ঐদিন ভাসমান পাম্পে কর্মরত সাহেদ ও শাহজাহান নামের দুইজনকে কক্সবাজার সদর থানার পুলিশ আটক করলেও রহস্যজনক কারণে ছেড়ে দেয়। অভিযোগ রয়েছে ঈদগাঁওয়ের রেজাউল করিম সিকদারের মালিকানাধীন তিনটি তেলের পাম্প রয়েছে। ওই পাম্প থেকে ড্রাম ভর্তি করে অবৈধ ভাবে মায়ানমারে পাচার করে আসছিল। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পাম্প মালিক রেজাউল করিম সিকদার বলেন, তার পাম্প থেকে কোনোদিন কোনো সময় মায়ানমারে তেল পাচার হয়নি। যে বোটে আগুন লেগে তেল পুড়ে গেছে সেগুলো অকটেন,নদীতে তার ভাসমান পাম্পে অকটেন বিক্রি হয় না বলে জানায় তিনি। অনুসন্ধানে জানা যায়, চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের ডজন খানেক মানবপাচারকারী দলের সদস্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মালয়েশিয়া গামী যুবকদের এনে চৌফলদন্ডীতে বিভিন্ন স্থানে রাখে। পরে সুযোগ বুঝে দালাল চক্রের সদস্যরা ফিশিং ট্রলারে তুলে দেয়। শীতকালে সাগর শান্ত থাকায় দালাল চক্রের সদস্যরা শীত মৌসুমকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাঠাচ্ছে লোকজন। ইতিপূর্বে একই স্থান থেকে গত বছরের নভেম্বর, ডিসেম্বরে ৩ টি চালান সাগর পথে মালয়েশিয়া লোকজন পাঠিয়েছে চিহ্নিত দালালেরা। অনুসন্ধানে জানা যায়,চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পশ্চিম পাড়া এলাকার কবির আহমেদের ছেলে মনজুর আলম,সাগর পাড়া এলাকার আবদু শুক্কুরের ছেলে মনজুর আলম এবং মাইজ পাড়া এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে শাহাজাহানের নেতৃত্বে ডজন খানেক মানবপাচারকারী রয়েছে। তারা একেকজন একেক দায়িত্ব পালন করেন বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের দলে রয়েছে, মৃত আমির হামজার ছেলে বেলাল মিয়া প্রকাশ ভেদু মিয়া, দক্ষিণ পাড়া পশ্চিম এলাকার মৃত আবদুল হাকিমের ছেলে আবদুল মজিদ,, দক্ষিণ পাড়া উত্তর এলাকার মৃত আবু বক্করের ছেলে মনি আলম, ৫নং ওয়ার্ডের মাইজ পাড়া এলাকার মাস্টার নুরুল কবিরের ছেলে সাহেদ, ৩নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাড়া উত্তর এলাকার মৃত মনিরুজ্জামানের ছেলে আমির হোছন, একই এলাকার ফকির আহমেদ প্রকাশ ফইরার ছেলে, পুলিশের সোর্স পরিচয়দানকারী যুবলীগ নেতা আরফাত, স্থানীয় বাজার এলাকার পশু চিকিৎসক ইদ্রিস মাহমুদ। উল্লেখিত দালাল চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন স্থান থেকে কৌশলে চুক্তির মাধ্যমে লোকজন নিয়ে এসে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচার করে। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, সাগরপথে মানবপাচার করতে আন্তর্জাতিক একটি চক্র বিশালাকৃতির জাহাজ কিনেছে। জাহাজটি বর্তমানে ইনানীর পশ্চিমে ১১ বিয় নামক স্থানে নোঙর করা রয়েছে। সংঘবদ্ধ মানবপাচার ও তেল পাচার চক্রের সদস্যরা জেলা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে কৌশলে চুক্তির মাধ্যমে লোকজন নিয়ে ওই জাহাজে তুলে দেয়। মুলত ওই জাহাজটি অবৈধভাবে লোকজন নিয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি জমায়।চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের ওই দালাল চক্রটি কম দামে ফিশিং বোট কিনে লোকজন সংগ্রহ করে বড় জাহাজে তুলে দেয়, একই সাথে দেশের সম্পদ তেল পাচার করছে চোরাকারবারিরা। স্থানীয়রা জানান, পুড়ে যাওয়া এফবি তানজিলা ফিশিং ট্রলারটি ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ক্রয় করেছিল পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা। পুড়ে যাওয়ার ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দেয় চক্রের সদস্যরা। সূত্রে জানা গেছে এর আগে দক্ষিণ পাড়া এলাকার মৃত ছৈয়দ আলীর ছেলে মোস্তাক আহমদ থেকেও ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি বোট কিনে ৩ বার লোকজন পাঠিয়েছে। ওই সব চালানে অন্তত ৫/৬ শতাধিক লোক ছিল বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রভাবশালী লোক হওয়ায় কেউ মুখ খোলার সাহস করে না। কেউ প্রশাসনকে অবগত করলে জানে মেরে ফেলার মতো হুমকি ধমকিও দেয় বলে জানায় কয়েকজন। অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, যুবলীগ নেতা আরফাত পুলিশের নাম ভাঙিয়ে তিন বার মানবপাচারকারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রফিকুল ইসলাম বলেন,আমাদের গোয়েন্দা টিমসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে, মানব ও জ্বালানি তেল পাচারকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে জড়িতদের আটক করে আইনের আওতায় আনা হবে। চৌফলদন্ডী ব্রীজ ঘাট এলাকাসহ স্পর্শকাতর স্পটগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হবে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

You cannot copy content of this page