Saturday, April 13, 2024

ভোটের সব প্রস্তুতি শেষ ইসির

টিটিএন ডেস্ক :

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চেকলিস্ট অনুযায়ী শেষ সময়ের কাজ শেষ করছে তারা। নির্বাচনের গোটা মাঠের নিয়ন্ত্রণ এখন আয়োজক এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির হাতে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে সারা দেশ।

এই মুহূর্তে মাঠ জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমানবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দখলে। নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে রবিবার (৭ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের কর্মীরাও তাদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ করে ভোটের দিনের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। তারা কেন্দ্রভিত্তিক পোলিং এজেন্ট চূড়ান্তকরণসহ ভোটের দিনকার কার্যক্রমগুলোর আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।

অবশ্য নির্বাচন কমিশনের এই প্রস্তুতির বিপরীতে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছে বিএনপি। তাদের সমমনা দলগুলোও এই হরতালের সমর্থন দিয়েছে।

জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে রবিবার ২৯৯টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। নওগাঁ-২ আসনের এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মৃত্যু হলে বিধি অনুযায়ী আসনটির ভোট স্থগিত করেছে ইসি।

মোট প্রার্থী ১৯৭০ জন
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী রয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। দলটির প্রার্থীর সংখ্যা ২৬৬ জন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ২৬৫ জন, তৃণমূল বিএনপির ১৩৫ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ১২২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ৯৬ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ৫৬ জনসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ২৭টি রাজনৈতিক দলের মোট প্রার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৫৩৪ জন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন আরও ৪৩৬ জন। ফলে এবারের নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭০ জনে। এর মধ্যে ৯০ জন নারী প্রার্থী ও ৭৯ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নির্বাচনে অন্য দলগুলোর মধ্যে ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, জাকের পার্টি, জাতীয় পাটি, জাতীয় পার্টি (জেপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), তৃণমূল বিএনপি, ন্যাশনাল পিপলস পাটি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটি, গণতন্ত্রী ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম.এল) প্রার্থী দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ ১৬টি দল এ নির্বাচন বয়কট করেছে।

গণপরিবহনে শিথিলতা
বরাবরই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ইসির অনুমোদন ছাড়া সব ধরনের যান্ত্রিক যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, এবার তা অনেকটাই শিথিল করা হয়েছে। এবার ভোটের দিন সড়কপথে ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক বাদে সব ধরনের যান চলাচল করতে পারবে। অর্থাৎ অতীতে ভোটের দিনে প্রাইভেট কার ও বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, এবার সেটা থাকছে না।

এদিকে নৌযানের মধ্যে এবার লঞ্চ ও ইঞ্জিন নৌকা চলাচল করতে পারবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট রুটে চলাচলকারী নৌযান চলতে পারবে। অবশ্য মোটরসাইকেল চলাচলে আগের মতো চার দিনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) দিবাগত মধ্য রাত (রাত ১২টা) থেকে সোমবার (৮ জানুয়ারি) মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বাচনি এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। অবশ্য নির্বাচনি এলাকায় ইসির অনুমোদিত মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যান চলাচল করতে পারবে।

ব্যালট যাবে ভোটের দিন সকালে
এবারের নির্বাচনে মোট ৪২ হাজার ২৫টি কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে দুর্গম ২ হাজার ৯৬৪ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের আগের দিন শনিবার ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। এ ছাড়া ভোটের দিন সকালে বাকি ৩৯ হাজার ৬১ কেন্দ্রে ব্যালট পেপার যাবে। এসব কেন্দ্রে ব্যালট সকালে গেলেও, আগের দিন (শনিবার) প্রিসাইডিং অফিসারসহ ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে ভোট কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করে রাখবেন। ব্যালট পেপার পরিবহন ও বিতরণে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, ভোট গ্রহণের দিন ভোরে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে হস্তান্তর করবেন। ভোট গ্রহণের দিন সকালে ব্যালট পেপার পরিবহনের বিষয়ে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
নির্বাচনে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ১৭ হাজার ১৪৩ জন আনসার সদস্য। বাকিদের মধ্যে রয়েছে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। ইতোমধ্যে গত ৩ জানুয়ারি থেকে ভোটের মাঠে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট আট দিন মাঠে থাকবেন তারা। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ সময় পর্যন্ত লাইসেন্সধারীরাও আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারবেন না।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম আমিনুল হক শুক্রবার জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটকেন্দ্র ও ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভোটদানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সারা দেশে ৫ লাখ ১৭ হাজার ১৪৩ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ১৪৯টি ভোটকেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা রক্ষায় ৫ লাখ ৫ হাজার ৭৮৮ জন সাধারণ আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ২৫০ প্লাটুন আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্যরা এক হাজার সেকশনে ভাগ হয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ দিন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন রয়েছেন। উপকূলের ১৩টি উপজেলা বাদে সব উপজেলায় আনসার ব্যাটালিয়নের একটি করে স্ট্রাইকিং টিম দায়িত্ব পালন করছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন হাজারের মতো এক্সিকিউটিভ ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে শুক্রবার থেকে মাঠে নেমেছেন আরও ৬৫৩ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। তারা ভোটের আগে-পরে পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করবেন।

এর আগে সারা দেশে ৩০০ আসনের জন্য ৩০০টি নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। তারা বিভিন্ন অপরাধে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের রেকর্ড সংখ্যক শোকজ, তলব ও জরিমানা করেন। এ ছাড়া এসব কমিটির সুপারিশে নিয়মিত আদালতে অর্ধশতাধিক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

১৮৬ বিদেশি পর্যবেক্ষক
নির্বাচন দেখার জন্য যে বিদেশিরা আবেদন জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ১৮৬ জন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদের মধ্যে ১২৭ জন পর্যবেক্ষক আর ৫৯ জন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মী। এ ছাড়া নির্বাচন দেখতে দেশি ২০ হাজার ৭৭৩ জন পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দিয়েছে ইসি। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে ৪০টি পর্যবেক্ষক সংস্থার ৫১৭ জন এবং স্থানীয়ভাবে ৮৪টি পর্যবেক্ষণ সংস্থার ২০২৫৬ জন ভোট পর্যবেক্ষণ করবে।

২২ সদস্যের মনিটরিং সেল গঠন
নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে ২২ সদস্যের মনিটরিং সেল গঠন করেছে কমিশন। এই মনিটরিং সেলের নেতৃত্ব দেবেন আইডিএ প্রকল্প-২-এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সায়েম। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, মনিটরিং সেল শনিবার সকাল ৮টা থেকে ৯ জানুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টা পরিচালনা করা হবে। শুক্রবার আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় ও মনিটরিং সেলের প্রধান আইডিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সায়েমের সভাপতিত্বে সেলের প্রাক-পরিকল্পনা বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার নির্বাচন
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ নির্বাচনে আসনপ্রতি ৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিশাল এ বাজেটের বেশির ভাগ অর্থই ভোটের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেছনে ব্যয় হবে। জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে প্রাপ্ত চাহিদা অনুযায়ী সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার ২২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং নির্বাচন পরিচালনা খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ১ হাজার ৫০ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৩ ভোটার তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৭ লাখ ৭১ হাজার ৫৭৯ জন পুরুষ; ৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৯ হাজার ২০২ জন নারী এবং ৮৫২ জন হিজড়া রয়েছেন।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

You cannot copy content of this page